Friday, 7 December 2018

সুবোধ ঘোষের 'চতুর্থ পানিপথের যুদ্ধ' (Caturtha Panipather juddha)

সুবোধ ঘোষের 'ফসিল' (Subodh Ghosher 'Fasil')

আমার গল্প


  • জ্যোতির্ময় সেনগুপ্ত


১ম পর্ব
<!-- @page { margin: 2cm } P { margin-bottom: 0.21cm } --> হাসির ছবি প্রদর্শনী
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে কাগজটায় চোখ রাখতেই একটা বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে গেল প্রবুদ্ধর। ডিস্ট্রিক্ট আর্ট গ্যালারিতে হাসির ছবি প্রদর্শনী আজ দুপুর বারোটা থেকে। এমনিতে ছবি দেখার পোকা নয় সে। কিন্তু বিজ্ঞাপনটা পড়ে মনে হল অনেকদিন প্রাণখুলে হাসেনি। ছবি দেখে যদি একটু হেসে নেওয়া যায় মন্দ কি ?
তাড়াতাড়ি চা-টা শেষ করে করবীকে বাজারের ব্যাগ আর টাকা এগিয়ে দেবার জন্য ডাকল। বলল, শুনছ আজ দুপুরে চলো আর্ট গ্যালারিতে যাই। বেশি রান্নাবান্নার দরকার নেই। মাছের ঝোল আর ভাত। বিকেলে ফেরার সময় না হয় চপ-টপ কিছু কিনে আনা যাবে।
সকাল সকাল এমন একটা বিদঘুটে আব্দার শুনে মেজাজটা চড়ে গেল করবীর। প্রবুদ্ধকে শুনিয়ে শুনিয়ে ছেলেকে বলল, ওই শোন তোর বাবা বোধহয় খেপেছে। ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই দুপুরে বেড়াবার ডাক ছেড়েছে। তাও কোথায়, না আর্ট গ্যালারিতে। উফ্ কী শখ ! যদি সিনেমা যাবার কথা বলত, তাও একটা কিছু বুঝতাম। না একেবারে আর্ট দেখাবে !
প্রবুদ্ধ কিছু বলার চান্সই পেল না। করবীর কথার তোড়ে ভেসে গেল। ছেলে আর মেয়ে তো বাবার এই উদ্ভট প্রস্তাব শুনে পাশের ঘরে হেসেই খুন।
ব্যাগ আর টাকা দিতে এসে করবী আবার বলে, হঠাৎ আর্ট গ্যালারিতে নিয়ে যাবার শখ হল কেন বলো দেখি ? ওটা একটা ঘোরার জায়গা হল ? লোকে ছুটির দিনে বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে বিকেলে কি সন্ধ্যায় বেড়াতে বেরোয় – বাজারে যায়, মলে যায় বা পার্কেও যায় অনেকে। তোমার তো ওসব বালাই নেই। যা-ও বা বহুদিন পর শখ গজালে, তা-ও কোথায়, না ভর দুপুরে আর্ট গ্যালারিতে। ওখানে ভদ্দরলোকে যায় ! দেখেছি না আগে। দুটো ঘর জুড়ে কয়েকটা মাথামুণ্ডু লাল-নীল-হলুদ ছবি। ওগুলোর সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটা লোক এমন মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে যেন সব বুঝে ফেলেছে। আমার বাবা বলতেন, কার যেন তুলি মোছার কাপড়কেই দারুণ ছবি বলে ক্রিটিকরা বাহবা দেওয়ায় উনি ফাঁপড়ে পড়েছিলেন। শোনো, ওসব ভূত মাথা থেকে নামাও। বাজারে যাও। সবজি যা পারো নিয়ে এসো, আর দয়া করে চেনা দোকানদারের কাছ থেকে পচা মাছটি উঠিয়ে এনো না।
প্রবুদ্ধ হাত বাড়িয়ে ব্যাগ আর টাকা নেয়। চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগে বলে, গেলে কিন্তু ভালো হত। অমনি হাতা-খুন্তি-সাঁড়াশির কনসার্ট শুরু হল যেন। আওয়াজের তীব্রতায় পাশের ঘর থেকে মনি-সুবুরা দৌড়ে চলে এল – কি হল মা ?
আরে দ্যাখ না, রোববারটা কোথায় সবাই মিলে বসে আরাম করে খাওয়া-দাওয়া করব – তোর বাবার বরোটার সময় আর্ট দেখাতে নিয়ে যাবার ভূত মাথায় চেপেছে। রোজ সকাল-সকাল রান্না হয়। আজ একটা দিনও কি নিস্তার নেই ? বাইরে বাইরে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াও তো বোঝ না। মেয়েদেরও একদিন রেস্ট চাই। উঠল বাই তো কটক যাই। মাছ-ভাত খেয়েই উনি বেড়িয়ে পড়বেন। যতসব আদিখ্যেতা। মনির আর্টের স্কুল আছে, সুবুর সামনে পরীক্ষা। দিদির বাড়ি কতদিন যাই না। ভাবলাম তোর বাবাকে নিয়ে আজ একটু ঘুরে আসব। কতদিন ওদের দেখি না।
    • মা, আমার আর্টের ক্লাস থেকে ফিরতেই তো দেড়টা বাজবে। তোমরা বারোটায় গেলে কী করে হবে ? তাছাড়া বাবা বলেছিল বিকেলে বিশালে নিয়ে যাবে।
মনিকে বাধা দিয়ে সুবু বলে,-- না বিগ বাজারে যাব। স্টার ওয়্যার আলটিমেটের সি.ডিটা ওখানে আছে শুনেছি। আর ফেরার সময় চিকেন-চিজ প্যাটিস খেয়ে আসব। যা টেস্টি না। বোন তুই একবার খাস। গত মাসে তো শুধু পচা রঙের গোল্লা খেয়েই কাটালি।
    • তুই চুপ কর তো। ওটা চিকেন না গরুর মাংস তুই জানিস? আর প্যাটিস তো … ওয়াক্ থুঃ। শক্ত শক্ত। ওটা একটা খাবার হল ? বিশালে মনজিন্সের কর্ণার খুলেছে। বাবা ওখানে কেক খাওয়াবে বলেছে। তাই না বাবা ?
          বিগ বাজারেও তো ফিফটিন্থে সুগার অ্যান্ড স্পাইস্ কর্ণার খোলার কথা ছিল। দেখি বাবা, পেপারটা দাও তো। ওপেনিঙের নিউজটা দিল কি না দেখি।
প্রবুদ্ধর বিশেষ কোনো উৎসাহ ছিল না মনজিন্স বা সুগার অ্যান্ড স্পাইসের কেক-এ। সুবু কাগজটা তার হাত থেকে ছোঁ মেরে নিতেই সে চেঁচিয়ে ওঠে – এই, ছিঁড়ে ফেলিস না দেখিস। ওতে দরকারি কথা আছে।
মনি জিজ্ঞেস করে – কী দরকারি কথা, বাবা ?
    ও তোরা বুঝবি না।
করবী ততক্ষণে চায়ের টেবিল ছেড়ে ফ্রিজ থেকে সবজির বাস্কেট নিয়ে রান্নাঘরে সরে গেছে। ছেলে-মেয়ে আর বাবার যুগলবন্দী কানে গেলেও আমল দিল না। সুবু-মনি কিন্তু বাবাকে চেপে ধরল। – বলো না বাবা, কী দরকারি কথা আছে। কোন পেজ-এ আছে ?
    তোরা বুঝবি না, বললাম না। ওসব বড়দের কথা। প্রবুদ্ধও টেবিল ছাড়ে। তারপর হাল্কা ভাবে বলে,– একটা হাসির ছবির কথা। ছোট্ট করে কথাটা বলেই সে গলা তোলে, – আমি বাজারে গেলাম।
          শেষ কথাটা যে করবীকে উদ্দেশ্য করে বলা তা সুবু-মনি বোঝে, করবীও। সুতরাং রান্নাঘর থেকে তার গলা শোনা গেল – কটা মাঝারি সাইজের চিংড়ি পেলে নিয়ে এসো। চিঁড়ের পোলাও বানিয়ে দিদির বাড়ি নিয়ে যাব। ওরা খুব খুশি হবে।
            প্রবুদ্ধর কানে যায় কথাটা। মুখে কিছু না বললেও জামাটা গায়ে গলাতে গলাতে সে নিজের মনেই গেয়ে ওঠে – তোমারো পরাণো যাহা চায়, তাই হোক, তা-ই হোক গো.......। তার দীর্ঘ নিশ্বাসটা রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছয় না। এবার সে কামদা অ্যাপার্টমেন্টের বি ব্লকের ফ্ল্যাট নাম্বার থ্রি জিরো ওয়ানের করবাবু ওরফে কামদার পেবোদা হয়ে বাজারে বেরোয়। বন্ধ দরজার ওপারে রয়ে যায় মনি-সুবু-করবীর ঝাঁপতাল সহযোগে আনন্দরাগিণী।
            ২য় পর্ব

ঘড়িতে তখন ঠিক সাড়ে তিনটে। ইডেনে নাইটদের খেলাটা শুরু হবো-হবো। করবী শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে টি.ভি-র ঘরে এল – কই গো, এখনও খেলা দেখছ যে। জামা-কাপড় পরো। আমরা তো রেডি। অ্যাই সুবু, বসে আছিস যে। যাবি না মাসির বাড়ি ? ওঠ্।
সুবু বলে, – দাঁড়াও না। খেলা শুরু হবে এখ্খুনি। তোমরা যাও, আমি পরে যাব।
করবীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল, – পরে যাবি মানে ! একা একা কীভাবে যাবি অতদূর ? তোকে আমি একা ফেলে যাবই না। তাহলে ফিরেও দেখব টি.ভির সামনে পড়ে আছিস। পড়বি না তো এক ফোঁটাও। যদি পড়তিস, তাহলে বুঝতাম। চল্ চল্। মাসির বাড়ি গিয়ে টি.ভি দেখিস।
অগত্যা রাগতভাবেই সুবুকে বিছানা ছেড়ে উঠতে হল। প্রবুদ্ধও জানত সুবুর রেজিস্টেন্সটা দুর্বল। করবী-ঝড়ে ছিটকে গিয়ে ওয়াড্রোবের সামনে পড়বে। তারপর একটানে পুরনো রঙ চটা নীল জিনস্ আর লাল-সাদা ডোরা কাটা টি-শার্টটা বার করে আনবে, দড়াম করে ওয়াড্রোবের দরজাটা বন্ধ করবে – উপহার হিসাবে পাবে মায়ের চোখ রাঙানি, কিন্তু দেখেও দেখবে না। এরপর পায়ে চটি গলিয়ে সোজা চলে যাবে ফ্ল্যাটের বেসমেন্টে। সবই হল। এবার তার পালা। অন্যদিন হলে এই উপলক্ষে একটা প্রশংসাবাক্য শোনা যেত স্ত্রীর মুখে। কিন্তু একে দিদির বাড়ি যাওয়ার আনন্দ, তায় দুপুরে রসনার পরিপূর্ণ তৃপ্তি। তাই বোধহয় একটু মলয় বাতাস বয়ে গেল – যাও, আজকে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবিটা পরে নাও। খেলা পরে এসে দেখে নিও।
জ্যাম ঠেলে সুবুদের মাসির বাড়ি অটোতে আধ ঘন্টা। বাসে খরচা একটু কম হলেও আজ দিদিকে সপরিবারে সারপ্রাইজ দেবার জন্য ঢাউস টিফিন ক্যারিয়ার সঙ্গে আছে। লিফটে নামবার সময় মনি ওটা নিয়ে প্রায় কাত হয়ে গেছে। প্রবুদ্ধ অটোতে বসে করবীকে জিজ্ঞেস করল, – কী কী নিলে ?
    কোথায় আর নিতে পারলাম। একটা বড় হটকেস কিনলে ভালো হত, জানো। কী অসুবিধে করে যে এ-টা নিয়ে এলাম। ঢাকনাটা ভালো করে আটকায় না। বাটিগুলো ছোট ছোট। ভাজাগুলো আঁটেই না। একবার বিগ বাজারে বড় হটকেস দেখেছিলাম। ওরকমটা হলে ভালো হত।
          মনি বাবার অবস্থাটা বোঝে, – মা, তুমি না যেন কি ! বাবা জানতে চাইল, কী কী নিয়েছ।
      করবীর হুঁস ফেরে – বলছি তো দাঁড়া না। বেশি কথা। … তারপর প্রবুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলে, – কী নিলাম? এই তো, দু-বাটি ফ্রায়েড রাইস। বাসমতীটা আনলে তো, ভাবলাম এনেছো যখন এটা দিয়েই করে ফেলি। পুরো প্যাকেটটাই রেঁধে ফেলেছি চিংড়ি বাদাম-টাদাম দিয়ে। একটু রেখে এসেছি – রাতে টেস্ট কোরো। আর কয়েকটা ইলিশ মাছ ভাজা, দিদিরা কাল ঝোল রেঁধে খেতে পারবে। আর তো মাত্র একটা বাটি। ওটাতে মাংস এনেছি। মিমিটা খুব ভালোবাসে। ব্যাস, এই তো।
      মনি ওধার থেকে ফোড়ন কাটে – বাবা, মা কিন্তু মাংসের ঝোল আনেনি, আলুও নয়। আর বাড়িতে ইলিশ-চিংড়ির স্টক ফিনিস।
      এর সঙ্গে যোগ হয় সুবুর টিপ্পনি – মা আমাদের ফিমেল কর্ণ।
      ফলে করবী রেগে গেল। রাগাটা স্বভাবিক। বাকি বাড়ির লোকগুলো কি না খেয়ে রয়েছে। সবসময় নজর এত নিচু কেন। জামাইবাবু দূরে থাকেন। সবদিন তো দিদি আর মিমি ভালো-মন্দ খাচ্ছে না। একটু না-হয় দেওয়াই হল। বাড়িতে তো প্রায়ই এটা ওটা খাওয়া হয়। তখন কি ওরা খেতে আসে না হাত বাড়িয়ে চাইতে আসে।
      কিন্তু রাগটা বেড়ে চলার বদলে থেমে গেল। কারণ অটোটাও দিদির বাড়ির সামনে থেমে গেছে। ভাড়া চুকিয়ে দোতলায় ওঠার মুখে প্রবুদ্ধ জিজ্ঞেস করল, – ফোন করে দিয়েছিলে তো ?
      ফোন করব কেন। এমনি দিদির বাড়ি আসা যায় না! তাছাড়া ওরা জামাইবাবু এলেই কোথাও বেরোয়। দু-দিন বাড়িতে থাকে – হয় সিনেমা নয় অন্য কোথাও নিয়ে যায়, মল-টলেও ঘুরে আসে। ওরা বেশ ভালোই আছে। ঘুরুক, সব তো আর আমার মতো কপাল না।
      এর মধ্যে ছেলে-মেয়ে দুটো ওপরে উঠে গিয়েছিল। ওরাই সিঁড়ির মুখ থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে খবরটা দিল, – মা, তালা।
      কী বলছিস ! ভালো করে দেখেছিস তো। কড়া নেড়ে দ্যাখ।
      বলতে বলতে করবী ওপরে উঠে গেল। প্রবুদ্ধর বুকে একটু আশার আলো খেলে গেল। স্ত্রীর পেছনে সে-ও দোতলায় উঠে দরজার মুখে দাঁড়াল। সত্যিই একটা বড় গোদরেজ তালা ঝুলছে। কোথায় গেল ওরা ?
      করবী সুবু-মনিকে বকতে শুরু করে দিল, – তোদের জন্য। সেই সকাল থেকে আসব না আসব না করছিলি।
      প্রবুদ্ধকে বাধা দিতে হয় – এখন চুপ করো তো। চলো, আরেকদিন আসা যাবে।
      দাঁড়াও, এগুলো কী করব ?
      নিয়ে চলো। কোথায় আর বসবে। কোথায় গেছে, কখন ফিরবে, কিছুই তো জানো না।
      সুবুরাও সায় দিল টিফিন ক্যারিয়ারটা ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। রাতের খাওয়াটা বেশ জমবে তাহলে। করবী, দাঁড়াও তো, বলে পাশের ফ্ল্যাটের ডোরবেল টিপল। মিনিট দুয়েক পর এক ভদ্র মহিলা দরজা খুলে বাইরে উঁকি মারলেন । প্রথমটা ঠিক বুঝলেন না আগন্তুকরা কারা। তারপরই, – ওমা করবী যে ! কতদিন পরে দেখলাম ! আজকাল কম আসো দিদির বাড়ি। তা তোমার দিদি তো এই একটু আগে বেরোল। আমার বউমাও সঙ্গে গেছে। চারতলায় রায়বাবুর ছেলের কাল অন্নপ্রাশন। ওই একটু গিফট্ কিনবে আর মিমিদের কোন বান্ধবীর বাড়ি যাবে। আমার নাতনিটাও একসঙ্গে পড়ে কি না। তা তোমরা কি একটু বসবে ?
      মনি তো একদম রাজি নয়, সুবু আগেই নীচে নেমে গেছে। ভদ্রমহিলার কথা শুনে প্রবুদ্ধর মনে হল তিনি চলে যেতেই বলছেন। কারণ এতগুলো কথা তিনি দরজা অল্প ফাঁক করে শরীরটা বাইরে বার করেই বলছিলেন। বাঁচাল করবীই। সে বলল, – না মাসিমা, বসি না আর। আমার ছেলেটারও এক বন্ধুর বাড়ি যেতে হবে নোটস্ আনতে। আপনি কষ্ট করে এটা একটু রাখবেন ? – টিফিন ক্যারিয়ারটা তুলে ধরল ভদ্রমহিলার সামনে। – দিদিকে বলবেন, মিমি আপনার নাতনি আর এ-বাড়ির বউদিকে নিয়েই যেন খায়। একটু ফ্রায়েড রাইস আর মাংস আছে।
      ভদ্রমহিলা খুশি হলেন মনে হল কিন্তু সেটা প্রকাশ করলেন না, – ঠিক আছে দাও। ওরা এলে দিয়ে দেব। উনি দরজার ভেতর অদৃশ্য হতেই করবীরা নীচে নেমে এল।
        এবার কী করা ?
        সুবু ঘ্যান ঘ্যান করতে শুরু করল – শুধু শুধু আই পি এল ম্যাচটা দেখা হল না। নাইটের ইমপরট্যান্ট খেলা ছিল। ফোন-টোন না করে চলে এলাম মাসির বাড়ি !
          মনিরও আব্দার শুরু হল বিশালে যাবার। শুনে সুবুও চাইল বিগ বাজারে যেতে। করবী কিছু না বলে হাঁটছে। মোড় অব্দি না গেলে ফেরার বাস বা অটো পাওয়া যাবে না। মিশন আনসাকসেসফুল। তাই ওর মুখ ব্যাজার। এই পরিস্থিতিতে আর্ট গ্যালারির কথা একবার মনে উঁকি দিয়ে গেলেও প্রবুদ্ধ কিছু বলল না। হাঁটতে হাঁটতে একবার জিজ্ঞেস করল করবীকে, – সুবুর কোন বন্ধুর বাড়ির যাবার কথা বলছিলে যে, যাবে নাকি ?
        কোথায় বললাম ?
        প্রবুদ্ধ ধরিয়ে দিল, – ওই যে ভদ্রমহিলাকে বললে না ?
        ওটা কথার কথা। নাহলে মাসিমা হয়ত বলতেন বাড়ি নিয়ে যাও। তাছাড়া দিদিকে বলতে পারবেন যে আমরা অন্য কোথাও গেছি, দিদিও শুনে আর মন খারাপ করবে না। পরে দিদিকে বুঝিয়ে বলা যাবে।
        তাহলে এখন কোথায় যাবে, বাড়ি ?
        সুবু-মনিরা বাড়ি ফিরতে রাজি নয়। ওদের শান্ত করতে শেষ পর্যন্ত বিশালে যাওয়াই ঠিক হল। বিগ বাজার আরেকদিন হবে। বাসে বাসে অত ঘোরা সম্ভব নয়। ওদের কাছে এটা নেই মামার চেয়ে কানা মামা লাভের মতো। অতএব মেনে নিল। এদের মুখে হাসি ফুটে উঠতে দেখে ভালোই লাগল। প্রবুদ্ধর মনে হল, ছোটদেরই মজা। তাদের উটকো বায়নাক্কাগুলোও বেশ মিটে যায়।
        বিশালে বেশি সময় লাগল না। বাসটা তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়ায় মলটাকে প্রায় ফাঁকাই পাওয়া গেল। মনির কেক খাওয়া আর সুবুর সি.ডি কেনা – দুই-ই হল। ভাগ্য ভালো স্টার ওয়ারের সি.ডিটা পাওয়া গেল। নইলে আবার একদিন বিগ বাজারে যেতে হত। করবীরও মন মেজাজ খারাপ। বিশেষ কোনো কথা বলছে না। মল থেকে বেরোতে পারলেই যেন বাঁচে। অতএব বিশাল থেকে যখন বেরিয়ে এল ওরা তখনও বিকেলের ভাবটা রয়েছে।
        অগোছালো ভাবে চারজন চলেছে বাসস্ট্যান্ডের দিকে। বাড়ি ফিরতে হবে। করবী তখনও চুপচাপ। প্রবুদ্ধ তাকে বোঝায়, – কী করবে মন খারাপ করে। সামনের রোববার না হয় ফোন করে সকালবেলাতেই ওদের বাড়ি যাওয়া যাবে।
        করবী কোনো জবাব দেয় না। প্রবুদ্ধ আশায় বুক বেঁধে বলেই ফেলে, – যাবে নাকি একবার আর্ট গ্যালারিতে ? এই তো সামনেই। পাঁচ মিনিটেই পৌঁছে যাব।
        করবী না বলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু মনি আর সুবু প্রস্তাবটা লুফে নিল। অবশ্য প্রদর্শনী দেখার জন্য নয় – সামনের পার্কে বসার জন্য। করবী সায় দিল, – তাহলে তুমি দেখে এসো, আমরা বাইরে পার্কে বসে থাকব। কতক্ষণ লাগবে তোমার ?
        প্রবুদ্ধ এই প্রস্তাবে রাজি হল না। বলল, – গেলে একসঙ্গেই যাব। তোরাও মজা পাবি, হাসির ছবি তো।
        হাসির ছবি ? সেটা আবার কেমন ?
        চল্ না। গেলেই তো দেখবি। আমি তো আর দেখিনি, কাগজে বিজ্ঞাপন দেখলাম সকালে, তাই বললাম।
        করবী জিজ্ঞেস করল, – হাসির ছবি প্রদর্শনী হয় নাকি ? হাসির ছবি মানে তো কার্টুন। কার্টুন এক্সিবিশন্ বলো তাহলে।
        মিকি মাউস না আর. কে ? সুবু জিজ্ঞেস করে।
        কার কার্টুন বা ছবি তাতো জানি না। বিজ্ঞাপনে দেখলাম। তাই বলেছি। এখন তোরা গেলে চল, না গেলে বাড়ি যাবার বাস ধরি।
        -কথায় কাজ হল। সবাই মিলে বাসে উঠল। সন্ধের আগেই পৌঁছে গেল গ্যালারিতে।
        ৩য় পর্ব

বড় হলঘরের তিনদিকের দেওয়াল জুড়ে সারি সারি মাউন্ট করা ছবি। প্রত্যেকটার নীচে একটা করে নাম দেওয়া আছে। ছোট ছোট আলোগুলো এমন ভাবে সাজানো যে আঁকা ছবিগুলোকে মনে হচ্ছে জীবন্ত। কোনোটা জল রঙের, কোনোটা তেল রঙের আবার কোনোটা শুধু পেন্সিলের স্কেচ। নানা রকমের মুখ বা মুখের আদল। ছবিগুলোর মাঝে মাঝে দেওয়ালে আবার মজার আয়না লাগানো। মনিরা সবাই আয়নায় নিজেদের চেহারা আর অদ্ভুতদর্শন ছবিগুলো দেখে খুব হাসছে। করবীও। প্রবুদ্ধও দেখছে ছবিগুলো। সবগুলোতেই হাসির ব্যাপার আছে বলে তার মনে হচ্ছে না। কয়েকটা তো মনে হচ্ছে আগে কোনো ম্যাগাজিন-ট্যাগাজিনে দেখা। ঘুরতে ঘুরতে একটা ছবির সামনে প্রবুদ্ধকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল।
আরে ছবিটার নীচে পেবোদা’ লেখা আছে !প্রবুদ্ধ আশ্চর্য হয়। তার নামে ছবি ! দেহটা বড় মাথাটা ছোট ছবির লোকটার। একখানা জ্বলন্ত উনুনের উপর বসে হাসছে। মাথাটা প্রবুদ্ধর কেমন ঘুলিয়ে গেল। একটা হাত এসে তার সঙ্গে করমর্দন করল। সে চোখ তুলে দেখল, ছবির লোকটা ! চারদিকে তাকিয়ে দেখল প্রবুদ্ধ – কিছু ভুল হচ্ছে না তো ? করবীরা একটু দূরে কার্টুন দেখে হাসছে। সব ঠিকই তো আছে। ছবির লোকটা ততক্ষণে হাত ছেড়ে দিয়ে খুব হাসছে। – কি, কেমন লাগছে এক্সিবিশন ? অনেকদিন তো প্রাণখুলে হাসোনি। এবার হাসি পাচ্ছে তো ?
আমতা আমতা করে প্রবুদ্ধ ওর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে – কিন্তু নিজের কার্টুন দেখে কার হাসি পাবে!
      নিজের ছবি ! কোথায় ? এটা তো আমার ছবি। অবশ্য এ-ছবি যদি কেউ নিজের বলে ভাবে তাতে আপত্তি নেই। আর নিজের ছবি দেখে হাসতে পারলে এর মতো মজা আর কোথাও পাবে না। বুঝেছ। মজাটি শুধু চারদিক দেখেশুনে খুঁজে বার করে নেওয়া। ব্যাস্। কেল্লাফতে।
      কীভাবে মজাটা খুঁজব? – প্রশ্নটা প্রবুদ্ধ যেন নিজেকেই করে।
      তবে উত্তরটা আসে ছবির ভেতর থেকে, – নিজের খুঁতটা খুঁজে নাও। ভাবো সেটা তোমার ভেতরের পেবোর খুঁত। এই পেবোটা কিন্তু অন্য লোক – এই যেমন আমাকে দেখছ। আমি তুমি নই আবার একরকম তুমিও। আমার ছবি দেখে তুমি থমকে দাঁড়াচ্ছ আবার হাসছ। একটু পরে তোমার বউ ছেলে-মেয়েও হাসবে। দুনিয়া অন্যের খুঁত দেখেই হাসে, মজা পায়। তুমিও পেবোকে অন্য মানুষ হিসাবে দেখ, জীবনে আসল মজা পাবে। এর জন্য প্র্যাকটিস দরকার।
        শেষের কথাটা কানে দুবার বাজল। প্রবুদ্ধ দেখল ছবির পেবোদা তেমনি দাঁত বার করে উনুনের ওপর বসে আছে। পাশ থেকে করবী সুবু-মনিকে বোঝাচ্ছে এরকম কার্টুন আঁকতে বহু প্র্যাকটিস দরকার। ওরা যে চলে এসেছে খেয়াল হয়নি প্রবুদ্ধর। সে করবীকে জিজ্ঞেস করে, – বাড়ি যাবে না ?
        দাঁড়াও অনেকদিন এভাবে হাসিনি। আরেকটু থাকি।
        ছবির নামটা নজরে আসতেই মনি চেঁচিয়ে ওঠে – দাদা দ্যাখ, বাবার নামে কার্টুন। করবী-সুবু পেবোদা’ লেখা কার্টুনটা দেখে হাসতে হাসতে প্রায় লুটিয়েই পড়ে আর কি !
        প্রবুদ্ধ হেসে ফেলে, বলে – এটা আমার নয়। তার মুখের অবস্থা দেখে মনিরা আরও জোরে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতেই আর্ট গ্যালারি থেকে ওরা বেরিয়ে আসে।
        বাসে ওঠার আগে প্রবুদ্ধ বলে, বাড়ি চলো। আজ সারাদিনে কতবার ওরকম কার্টুন হলাম দেখাব। ছবি এঁকে রাখিস তোরা।
          --------------------------

Sunday, 2 April 2017

দাহ্য ( ভাষান্তরিত অনুগল্প)



দাহ্য
মূলবিশ্বজ্যোতি দেব মহন্ত (ভাষান্তর জ্যোতির্ময় সেনগুপ্ত)

সিঁদুরের কৌটোটা সে আলতো ভাবে হাতে তুলে নিল। বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে ঢাকনাটা সামান্য ফাঁক করে কৌটোটা সাবধানে খুললো। এবার সে দেশলাই-কাঠির মাথায় ঢাকনার চারপাশটা আস্তে আস্তে চেঁছে নিল। যাক বাবা! আজকের মতো সিঁদুরের কাজ শেষকাঠিটা নষ্ট করা যাবে না – মাথাটা ভালো করে মুছে আবার বাক্সে ভরে রাখতে হবে। ওদিকে আবার চারালির লেবারগুলো কাজে বেরনোর আগেই গরম গরম চা ‘রেডি’ রাখতে হবে। ভাঙা আয়নাটার সামনে সিঁদুর পরতে গিয়ে হঠাৎ মনে হল ...... আয়নাতে আজ একজন নয়, তার মত দেখতে দুজন, দশজন বা বিশজন যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে সিঁদুর পরছে।
আজ খুব গরম। চারালির কোণটায় সে অন্যদিনের মতই বসে পড়ল। ময়লা ন্যাকড়াটা দিয়ে ফিতেগুলো টেনে স্টোভটা একবার নেড়ে দেখল – যা তেল আছে তাতে আজকের দিনটা চালানো যাবে। দেশলাই কাঠিটা প্রথম ঘষায় জ্বলল না। ধুস, দিনের ‘কামাই’তে নজর লাগল নাকি!! ধ্যাৎ, তা কেন? কাল সে বাটা দিয়ে আসবে। ভগবান কি আর মুখ তুলে চাইবেন না? যাক কাঠিটা জ্বলল! বাঃ কি লালাভ আগুন! ঠিক তার মাথার সিঁদুরের মতোই।
আজ বেশ দেরিই হয়েছে। খদ্দের আসা শুরু হয়ে গেছে। স্টোভের আগুনটাও নিভু নিভু। আর কত! স্টোভই তো গ্যাস তো আর নয়! এখানে আসার আগে সকালে এটাতে বাড়ির সবার জন্য ভাত রাঁধা হয়েছেসকালে ঘুম থেকে উঠে তারা চা খায় না তাই – নইলে তো এ আরও গরম থাকত। এভাবে গত এক বছর ধরেই স্টোভটা জ্বলছে। রাস্তার ধুলো লেগে সে ‘নোংরা’ হয়েছে। কতটা ‘নোংরা’? ...... সে ভাবল। নাইট ডিউটির সেই পুলিশগুলোর জিভের চেয়েও নোংরা? ওদের আর কি বলবে সে! তারা তো তার ছেলের বয়সীই। সেজন্যই তো সে বউটাকে সঙ্গে নিয়ে আসে না। সোমত্ত বউ, কার নজর পড়ে কে জানে! তার চেয়ে যে কয় ঘরে সে ঠিকে কাজ খুঁজে নিয়েছে তাতে লেগে থাকলেই ভালো।
স্টোভের আঁচ বাড়িয়ে কেটলির মুখটা সে খুলে দেখল, চায়ের জল ফুটছে। ভাড়াবাড়িটিতে এতক্ষণে হয়ত তার বউমা স্নানটান সেরে কাজে বেরনোর জন্য তৈরি হচ্ছে। ভাঙা আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধতে তার খুব একটা দেরি হয় না। তারপর একবার ব্লাউজের হুকগুলো ঠিকঠাক আছে কি না দেখে আঁটোসাঁটো করে কাপড়টা গায়ে জড়িয়ে নেয়, ব্যস এটুকুই। মেয়েটার কাঁচা বয়স, গড়ন ভালোটগবগে যৌবন, কেটলির ফুটন্ত জলের মতোই। আর সে! সে যেন এই স্টোভটাই – সারাক্ষণ জ্বলছে!! – আর এভাবে জ্বলতে জ্বলতেই গত বছর শহিদ হওয়া একমাত্র ছেলেটার মতো হঠাৎ সেও একদিন নিভে যাবে।
                                                                           -----------------

Monday, 16 January 2017

লক্ষ্মীর পাঁচালি (গল্প)



লক্ষ্মীর পাঁচালি

জ্যো তি র্ম  সে গু প্ত 

জল ঝরছে অঝোরে কখনও একটু থামছে, ঝিরিঝিরি থেকে টিপটিপ তারপর আবার...... রাস্তায় কাদা থিকথিক পুরনো বাঁশের বাতা আর মরচে ধরা তারের বাঁধনে চেনা-অচেনা গাছপালাগুলো বিধু সরকারের কাঠাখানেক জমিকে ঘিরে রেখেছে দুপুরের আলোয় বিষণ্ণতার ছোঁয়া ঠিক সেই সময় দাওয়ায় তার কাদা মাখানো একজোড়া পায়ের ছাপ পড়েই গেলভেতর থেকে দুটো কড়া চোখের চাহনি সশব্দে আছড়ে পড়ল ঐ কাদামাখা ছাপের পায়ে – ‘লক্ষ্মী না’!!?
দুটো পা আর তার ল্যাপটানো কাদাছাপ আটকে গেল ওখানেই। মুখটা নেমে এল বুকে ঢিপঢিপ শব্দটা দলা পাকিয়ে উঠতে লাগল গলা লক্ষ্য করে। কানে এল ভেতর থেকে কয়েক জোড়া পায়ের দুপদাপ আওয়াজ, ‘কে, কেগো? কে এলো?!! অ্যাঁ তুই...!?’
সোজা তাকাতে সাহস হল না, কিন্তু সামান্য মুখ তুলে চোখের কোনা দিয়ে দেখল পিসিমা দরজা আগলে দাঁড়িয়েছেন, আর তাঁর প্রসারিত দুবাহুর দেয়াল ডিঙিয়ে আরও দু-তিনটি উৎসুক চোখ। এতদিন পর কইত্থাইকা আইলি মুখপুড়ি? লক্ষ্মীছাড়াটা আসে নাই? একা আইসস? বাচ্চাদুইটা কই? তা হেইগুলানরে খাইয়া আইলি নাকি মরার মাগী!!?’ তার কানের ভেতর দিয়ে যেন গরম সীসে কে ঢেলে দিচ্ছে। বুকের দলাটা ততক্ষণে বোবা মুখ থেকে আরও ওপরে উঠে চোখের কোণ বেয়ে গড়াতে শুরু করেছে। মাথাটাও কি একটু ঘুরে উঠল?
লক্ষ্মী, নারে দেবি? আইসে ক্যান জিগা তো!’ না, এ রুক্ষ প্রশ্নের জবাব আর সে দিতে পারল না। তার আগেই মনে হল সে হাল্কা হয়ে যাচ্ছে, একটা কালো চক্কর, ব্যস আর কিছু নয়।
দেবি পিসি ছুটে এসে কোলের ওপর মাথাটা না রাখলে হয়ত দাওয়াতেই গড়িয়ে পড়ত দু-তিন মিনিট মনে হল সে অন্ধকারে ভাসছে। তারপর আবছা ভেসে উঠছে

কয়েকটা মুখ, চারপাশ থেকে কানে আসছে গোমড়া আওয়াজ। উঠে বসার চেষ্টা করল সে, পারল না। কে কি বলছে তাও সে বুঝতে পারছে না। শুধু তার মনে হচ্ছে একটু উঠে বসতে হবে, কথাগুলো বলতে হবে কিন্তু চোখের পর্দায় ঝলকে উঠছে গলার শিরা ফোলানো একটা অসহায় শুকনো মুখ যার চোখের মণি ঠিকরে বেরিয়ে এসে যেন তাকে তাড়া করছেসে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কনুইতে ভর দিয়ে আবার চেষ্টা করল উঠে বসতে। এবার পিসিমার গলা কানে এলো – ‘উঠতে অইব না শুইয়া থাক একটুক্ষণ। অই গইন্যা ...... মারে কদুধটা গরম কইরা লইয়া আইতে।
--হ্যারে দুধ খাওয়াইবার কি কাম? বাইচ্চাগুলান কি উনা প্যাটে থাকব? আকাশের অবস্থা দেখতাসস না? এর পরে তো খাওনের লেইগ্যা খড়কুটাটাও পাওন যাইব না। চখে-মুখে জল ছিটাইয়া দে। উঠলে তগো লগে দুইডা শুদা ভাত খাওয়াইয়া দিস পিয়াজ আর লঙ্কা পোড়া দিয়া
-- চুপ করো তো তুমি, আমি দ্যাখতাসি কি করন যায়।
বাবা আর পিসির কথাগুলো এবার তার কানে ঢুকল ঠিকঠাক। সে বলতে চাইল যে তার খাবার চাই না, না দিলেও কিছু করার নেইবরং যা সে হারিয়েছে তার কিছুটা যদি এখান থেকে নিয়ে যেতে পারে তাতেই সে খুশি হবে। কিন্তু কথাটা তার মুখেই রয়ে গেল, গলার স্বর ফুটে বেরল না। চোখ দুটো সামনে বসা পিসিমার মুখের ওপর থেকে সরে গেল একবার বাঁয়ে, একবার ডানেতারপর আস্তে আস্তে ডানদিকের দেওয়াল বেয়ে কড়িকাঠ হয়ে বাঁ-দিকের দেওয়ালে ঘুলঘুলির আলে একটা শালিক দিনের ধূসরতা গায়ে মেখে ন্যাতানো পালকের ভেতর ভেজা ঠোঁট মুছতে চাইছে বার বার ঘরের ভেতরে আবছা অন্ধকার, সন্ধ্যে নামলে যদি কারেন্ট না আসে তবে হ্যারিকেন জ্বালানো হবে বোধহয় ডানদিকের দেওয়ালে কয়েকটা চেনা ছবি, মায়ের হাতের কাজযেমনওঁ পতি পরম গুরু’, ‘তব নামহি কেবলম’, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’এছাড়া আছে এ-বাড়ির একটা সম্পদ – কালো ফ্রেমে বাঁধানো একটা হলুদ হয়ে যাওয়া গ্রুপ ছবি।
সে ঠাকুরদাকে দেখেনি, এমনকি তাঁর কোনো ছবিও নয়। কিন্তু ছোটবেলাতেই শুনেছে ওই ছবিতে তার ঠাকুরদা আছেন। মাঝখানে গোল ফ্রেমের চশমা পরা গোলগাল লোকটি নাকি নেতাজি সুভাষ, ওর ঠিক পেছনে দ্বিতীয় সারিতে দাঁড়ানো দাড়িওয়ালা মানুষটি নাকি তার ঠাকুরদাদা। আই.এন.এ-র সঙ্গে এসেছিলেন, তারপর বন্দী। ছাড়া পেয়ে নাকি তিনি কোহিমা থেকে নেমে লামডিঙে মাথা গুঁজেছিলেন সঙ্গে পরিবার বলতে খুড়তুতো ভাই তার বউ আর মা-মরা একমাত্র ছেলে রেললাইন পাতার কাজ তখনও শেষ হয়নি লোকালয় বলতে কালীবাড়ি সংলগ্ন অঞ্চল আর ছোট্ট রেল স্টেশনকে ঘিরে দুপাশে রেলবাবুদের বসতি একদিক থেকে অন্য দিকে যাবার উপায় মাঝখানের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একটি পায়ে চলা সরু সরলরেখা স্টেশনের ওপারে পূবদিকে একটা উঁচু টিলার ওপর রেলসাহেবদের বাংলো, টেনিস খেলার কোর্ট আর ক্লাব ঠাকুরদা কালীবাড়ির পেছনে ফরেস্ট এরিয়ায় একটি কাঠের তৈরি বাড়িতেই এসে উঠেছিলেন আর সেখানেই তিনি মারা যান পঞ্চাশ সনে অভিভাবকহীন বাবা তখন এদিক ওদিক ঘুরে রেলের স্লিপার পাতার কাজে লেগে গিয়েছিলেন কাকা-কাকিমাকে ছেড়ে থাকতে শুরু করেন লাইনের পারে রেল-গুমটিতেসেখানেই মা-কে খুঁজে পেয়েছিলেন।  কিন্তু সুন্দরী ছিলেন বলে মায়ের ওপর অনেকের নজর ছিল, তাই বাবা মা-কে নিয়ে পালিয়েছিলেন ভবঘুরেদের জীবনে সেসব কাহিনি রূপকথার গল্পের মতো শোনায় মা- বিবাহিত জীবনের  শুরু থেকেই লড়াই পেট চালাতে শুরু করেন শালপাতা, শুকনো গাছের ডাল, ঘুঁটে বিক্রির কাজ দুজনের কারোই পেটে বিদ্যে ছিল না বাবাও এটা সেটা করে দিন কাটাচ্ছিলেন বাজারে চায়ের দোকান চালাতে চালাতেই হঠাৎ ভাগ্য খুলে গেল কাঠের মিলে তদারকির কাজ মিলল দুটো পয়সা হল, মায়ের কোলে লক্ষ্মী আর নারায়ণ এলো মিল মালিকের বদান্যতায় এই ওদালির কিনারায় এক টুকরো জমি পেলেন তিনি, আসলে চৌকিদারি করবার প্রতিদান ফরেস্ট এরিয়া, মালিকের ইজারা নেওয়াসুতরাং জমি বিলি তাঁর হাতের মুঠোয় দশবারো ঘর বসতি নিয়ে গোটা একটা পাড়াই হয়ে গেল দরমার বেড়া আর পাতলা টিনে ছাওয়া ঘরে বাবা এসে উঠলেন সঙ্গে দেবি পিসি আর কাজলা ঠাকমা দেবি পিসি তার আপন কেউ নয়, কিন্তু নিজের পরিজনের চেয়েও বেশি কাছের কাঠ চেরাইয়ের কলে পিসির দাদা বেঘোরে জান দেওয়ার পর থেকে বাবাই পরিবারের বাকি দুজনের অভিভাবক সুতরাং মা ছাড়া অন্য দুজন মহিলার কোলে পিঠেই -বাড়িতে তার বেড়ে ওঠা সে বুঝতে পারছে, বাবার রাগ এখনও পড়েনি মা নেই, ঠাকমাও সেই কবেই গত হয়েছেন; এমন দিনে পিসিই তার একমাত্র ভরসা
হলুদ হয়ে যাওয়া ছবিটা থেকে চোখ সরিয়ে এবার সে পিসির মুখটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করল ততক্ষণে ঘরের ভেতর আরেকটু অন্ধকার নেমে এসেছে বৃষ্টিটাও জোর বাড়িয়েছে কারেন্ট নেই, একশ ওয়াটের বালবটা তাই বোবা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে পিসির কাছ থেকে কি ছবিটা ধার নেওয়া যায়? পিসি যদি বাবাকে বলে ছবিটা তাকে দেন – অন্তত কয়েকটা দিনের জন্য? কিন্তু এই ছবি নিয়েই বা কি কাজ হবে? বরং এটার চেয়ে অনেক বেশি কাজে দেবে কোন একটা ছাপমারা কাগজ। কোথায় আছে সেই গুপ্তধন? এখানে থাকতে সে কখনও ভোট দেয়নি, তাই ভোটের কাগজ যে নেই সে বিষয়ে সে নিশ্চিত। কিন্তু কাগজই তার চাই কি না সেটাও তো তার জানা নেই। তাকে তো জানাতে হবে কানাইয়ের বাপের কথা, শ্বশুরের কথা। পিসিরা কি সেসব শুনতে চাইবে? কথাগুলো দলা হয়ে বুকে আটকে আছে। সে শুয়ে শুয়ে পিসির মুখের রেখাগুলো পড়ে নিতে চাইছে। কিন্তু বৃষ্টি আর অন্ধকারের যুগলবন্দীতে তার দৃষ্টি আর মনের কথাগুলো দোল খাচ্ছে।
‘এখন একটু ভালো লাগতাসে? দুধটা খাবি?’ – পিসির কথায় সে যেন একটু সম্বিৎ ফিরে পেল। পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে সে টের পায়নি কখন গইন্যা না গনা বলে ওই বাচ্চা ছেলেটি একটা দুধের গ্লাস পিসির হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেছে। ছেলেটার মাও এসে দুদণ্ড দাঁড়িয়ে ননদের অবস্থা আঁচ করতে চেষ্টা করেছে আবার চলে গেছে নিজের কাজে কিন্তু এসব ঘটনা তার চোখের আড়ালে ঘটে গেছে এখন তার বিছানায় দেবী পিসিই একা বসে আছে সে কনুইতে ভর দিয়ে উঠে বসতে চেষ্টা করতেই পিসি একহাতে দুধের গেলাসটা ধরে অন্য হাতটা তার ঘাড়ের নীচে পেতে দিলেন‘ উইঠ্যা ববি? দেখিস মাথাটা আর ঘুরায় না তো? না সে ঠিক আছে, এখন অনেকটা ভালো লাগছে পিসির বাড়ানো গ্লাসটা সে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল তারপর এক ঢোকে সমস্ত দুধটা খেয়ে ফেলল হ্যাঁ, এখন মনে হচ্ছে সত্যিই খিদে পেয়েছিল। ওঘর থেকে বাবা লুঙ্গির গিঁটটা ঠিক করতে করতে এগিয়ে এলেন – ‘ বড় সাদ কইরা নামখান থুইসিলাম, লক্ষ্মী – হাঃ, ধনের দেবী। কই আর ধন! উল্টা সব ভাসাইয়া গেলি গিয়া। অখন আবার ফিইরা আইলি ক্যান কে জানে!’
‘তুমি আবার উইঠ্যা আইলা ক্যান। কইলাম না দ্যাখতাসি।’ পিসি একটু ধমকের সুরেই বাবাকে কথা দুটো বললেন। ‘হ, রাখ। তুই আর কি দেখবি। আমি আওন দেইখ্যাই বুজছি।’ — মেয়ের দিকে তাকালেন এবার তিনি। বাবা মেয়ের চোখে চোখে মিলন আবার বহুদিন পর হচ্ছে। সে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। বোবা কান্নায় ভেঙে পড়ল পিসিমার কাঁধে
‘আঃ তুমি যাও দেখি। গইন্যার মায়রে কও সন্ধাবাতিটা দিতে।’
না, বোনের কথায় বিপিন সরে গেলেন না। বরং মেয়ের রকম-সকম বুঝতে চেষ্টা করলেন। দেখলেন সিঁথিতে সিঁদুর আছে কি না, হাতে নোয়া-শাঁখা আছে কি না। না নেই, শুধু মনোরমার দুগাছা চুড়ির ভেতর  একখানা যে আছে তা ঠাহর করলেন। ‘জানতাম, আমি ঠিক জানতাম। এইরকমই কিসু একটা হইব।’
দাদার উচ্চকণ্ঠ দেবী পিসি আর তাকে চমকে দিল। দুজনেই বিপিনের দিকে চোখ ফেরালেন দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আরও দু-তিনজোড়া উৎসুক চোখ তারা বিপিনের চিৎকার শুনে ছুটে এসেছে ‘নির্ঘাত এই মাইয়া সব খাইয়া আইসে। দ্যাখ দ্যাখ! মাথায় সিন্দুর নাই হাতে বিয়াত্তের কোন চিন্ন নাই। মাইয়ারে সোহাগ কইরা মায় একজোড়া চুরি দিসিল, দ্যাখ তার একখানই আসে।’
পিসি এবার লক্ষ্মীর হাতখানা টেনে নিলেন। সত্যি তো! একেবারে খালি, এয়োতির কোন চিহ্নই নেই। সিঁথিও শূন্য। আচ্ছা সে নাহয় জলে ভিজে ধুয়ে গেছে। কিন্তু হাতে শাখা-পলা তো থাকবে! তিনি লক্ষ্মীর চোখে চোখ রাখলেন।  কিছু জিজ্ঞাসা, অনেক উত্তর এইসময় ঘরের অন্ধকারে ঘোরাফেরা করছে কিন্তু সে এবার পিসির হাত ছাড়িয়ে বিছানা থেকে প্রায় লাফিয়ে নামল আর জলের ঢেউয়ের মতো বাবার বুকে আছড়ে পড়ল বিপিনের হাতদুটো আস্তে আস্তে মন্ত্রচালিতের মতো মেয়ের পিঠে আর মাথায় এসে ঠেকেছে তার মনে হল, এতদিন পর একটু যেন কোথাও শান্তিতে মাথা রাখার জায়গা পাওয়া গেছে
বাপ-মেয়ের মান-অভিমান পালায় পিসি বেশিক্ষণ নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারলেন না – ‘অতক্ষণ ত কত শাপ-শাপান্ত করতাসিলা। অখন দেখি সোহাগের বইন্যা বইতাসে। মাইয়া ক্যান আইসে ঘুইরা, জিগাইবা না?’ বিপিনের চোখে জলের রেখা দেখা গেল। সেটা নজরে আসতেই পিসি আবার মুখ খুললেন – ‘মাইয়া ঘরের লক্ষ্মী, বুঝছ। সে ঘরে আসে মানে ঘর আলো হয়, সংসারে সোনা ফলে। আর তুমি তাড়াইয়া দিতে চাইসিলা। পারলা?
হঠাৎ করে মেয়েকে বুকের মাঘে পেয়ে বিপিন বিহ্বল হয়ে গেলেন, আপনিই মনটা বর্ষার জলে ভেজা বাইরের মাঠের মতই থিকথিকে হয়ে উঠল। মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে তিনি বললেন – ‘মাইয়াডা ঠিক তার মায়ের মতন হইসে। কিসু হইলে এই বাপ ছাড়া আর কাউরে লাগে না।’ ঠিক এই সময় কারেন্ট এলো, একশো পাওয়ারের বালবটা জ্বলে উঠতেই ঘরময় আলো ছড়িয়ে গেল। সে তখনও বাবার বুকে মুখ গুঁজে। ‘অই দ্যাখ, মাইয়ার কাণ্ড। এত কান্দে না মা। যা হইবার তা তো হইসেই। অরা তরে খুব দুঃখ দিসে, না রে!? পোলাপান দুইটারে দ্যাখনের বড় হাউস আসিল। যাউক যা হইবার হইব। হ্যারা যদি আইতে দ্যায় নাই তো কি করবি! আমি যামু নে পরে। যা অখন একটু পিসির কাসে ব। খাইয়া-দাইয়া সব কথা শুনুম নে। নে দেবি, ধর, অরে একটু সামলা।’
দেবী ভাইঝিকে কাছে টেনে বসালেন। দরজার কাছ থেকে উৎসুক চোখগুলো সরে গেল। তাদের এখন অন্যত্র আসর জমাবার পালা। ওদিক থেকে শাঁখের শব্দ শোনা যাচ্ছে, ধুপকাঠির গন্ধটাও ভেসে আসছে। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে সুর মিলিয়ে গনার মায়ের পাঁচালিও এঘর থেকে শোনা যাচ্ছে – ‘যে বা পড়ে, যে বা শোনে, যে বা রাখে ঘরে, লক্ষ্মীর কৃপায় তার ধনে জনে বাড়ে।...’


()
সুধেন্দুর চিতার আগুন তখনও নেভেনি চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকজন আগুনের শিখায় তারা প্রত্যেকেই লালাভ দুটি শিশু একটু দূরে দাঁড়িয়ে বিহ্বল হয়ে দেখছে তাদের পাশে উপুড় হয়ে পড়ে আছে লক্ষ্মী
একটু আগে দেবুকে নিয়ে এসেছিল ওরা দশ মিনিট বড়জোড় ছিল থান কাপড় জড়িয়ে মুখাগ্নি করতে যতটুকু সময় তার সঙ্গে দুটো কথে বলাও হয়নি ছেলেদুটো একবার দৌড়ে গিয়েছিল তাদের বাবার হাত ধরার জন্য কিন্তু খাকি পোষাকের রক্তচক্ষুকে ডিঙিয়ে তাদের পক্ষে বাবার কাছে পৌঁছনো সম্ভব হয়নি
দেবু একবারের জন্যও লক্ষ্মীর দিকে তাকায়নি অন্তত লক্ষ্মীর তা চোখে পড়েনি শুধু মনে হয়েছিল কানাইয়ের বাপ একবার যেন ছেলেদুটোকে খুঁজল সারাক্ষণ দেবু সুধেন্দুমোহনের নিথর দেহের চারদিকে কাঠবোঝাই চিতাটার দিকেই তাকিয়ে ছিল শ্মশানে মড়া পোড়ানোর ঢিবিটার পাশে যে কালো জলের ধারাটা আছে সেখানে তার স্নান হল, একটা ময়লা থান কাপড় তার কোমরে জড়ানো হল, একটা আধময়লা লাল গামছা দিয়ে মাথাটা মুছে নিয়ে সেটা সে কাঁধে ফেলল, তারপর চলল বাপের সাজানো চিতার কাছে ডানপা থেকে লোহার শেকলটা তখনও খোলা হয়নি সেটা নিয়েই ঘষটে ঘষটে পারে উঠল বসন্ত সর্দারেরা পাড়ায় বামুন খুঁজে পায়নি খবর শুনে দেবুর এক সবজি ব্যাপারি দোস্ত চলে এসেছে পারমার্থিক কাজগুলো করতে তার বাড়ির কুলুঙ্গি থেকে ছেঁড়া গীতাটা নিয়ে এসে ওটা দিয়েই কাজ চালাচ্ছে দাহকর্মটা উতরে দেওয়া আর কি তাই মন্ত্রোচ্চারণে কোন আড়ম্বর নেই না কথকের না শ্রোতার যন্ত্রচালিতের মতো দেবু দোস্তের হাত থেকে জ্বলন্ত পাটকাঠিগুলো নিয়ে তিনিপাক ঘুরল চিতার চারদিকে, তারপর গুঁজে দিল সাজানো কাঠের ফাঁক দিয়ে লক্ষ্মীর সঙ্গে তখন তার গলা মিলিয়ে বাবাগো বলে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছিল কি না, কেউ জানে না তবে আগুনের আভায় তার চোয়ালের ভেতর বসানো হাড়গুলোকে উদ্ধত হয়ে ঊঠতে দেখা যাচ্ছিল, চোখের মণিতে ঝলসে উঠছিল আগুনের শিখা
লক্ষ্মীর চিৎকার আর কাঠফাটার আওয়াজ ছাড়া আর সবকিছুই ছিল শুনশান এমনকি চিতার অল্প দূরে যে ছোট্ট কালো জলের নালাটা আছে, যেখানকার নোংরা জল  আজ সুধেন্দুমোহনের কাছে গঙ্গা তারও বয়ে যাবার কোন আওয়াজ নেই একটা অজানা আশঙ্কায় সাবাই চুপ লক্ষ্মীর চিৎকারটা সত্যি, কিন্তু কতটা যথার্থ তা শ্মশানে উপস্থিত বাকি লোকেদের জানা নেই যারা আইনের রক্ষক তাদের কারো মন গলিয়ে দেবার মতো শক্তি লক্ষ্মীর চিৎকারে নেই বরং থানার ছোটবাবুর হাবভাব দেখে মনে হয় লক্ষীকে থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে বরাবরের জন্য তাকে চুপ করিয়ে দিতে পারেন কিন্তু না, শুধু একবার লক্ষ্মীর মাথায়-পিঠে লোমশ হাতখানা বুলিয়েই তিনি সরে গেলেন হাবিলদারটাকে নির্দেশ দিলেন, চল, ব্যাটাকে নিয়ে ভ্যানে ওঠা
লক্ষ্মী কাতরভাবে চেঁচিয়ে উঠল, দারোগাবাবু, দারোগাবাবু গো, অরে লইয়া যাইয়েন না, কানাইয়ের বাপ ছাড়া আমার আর কেউ নাই গো বুড়া হউক খোড়া হউকবাপটাই ছিল মাথার উপ্রে পোলার শোকে শোকে সেও তো আর থাকল না অখন কানাইয়ের বাপ ছাড়া অগরে, আমারে আর কে দেখব গো অরে নিও না অরে নিও না অরে নিও না গো
ছোট দারোগার পা জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে লক্ষ্মী কিন্তু অভ্যাসবশে দারোগাবাবু একটু দূরে সরে যান আর মুচকি হেসে বলেন, আমরা তো আছিই চিন্তা করিস না অসুবিধা হলে ক্যাম্পে আসিস তোর সোয়ামি তো রইলই আমাদের কাছে
দুজন কনস্টেবল এসবে ভ্রূক্ষেপ না করে দেবুকে হাতকড়া পরিয়ে ঠেলে তুলল প্রিজনভ্যানে অন্য দুজন লক্ষ্মীকে চ্যাংদোলা করে তুলে ছোটবাবুর কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল লক্ষ্মী হাত-পা ছুঁড়ছে, কিন্তু ওরা দুজন লক্ষ্মীর চেয়ে অনেক বেশি সবল তাছাড়া বিস্রস্ত বেশবাসের ভেতর দিয়ে লক্ষ্মীর অযত্ন লালিত দেহাবয়ব ওই দুজনের চোখে যে অধরা থেকে গেছে তা- নয় মদ দায়িত্বের যৌথ উত্তেজনায় তাই টানাটানির পর্বটা একটু বেশিক্ষণ ধরেই চলছিল প্রিজনভ্যানের ড্রাইভার ছাড়াও অন্য দুজন হাবিলদার কাছেই ওঁত পেতে দাঁড়িয়ে ছিল, বোধহয় সুযোগের অপেক্ষাতেই
সুধেন্দু যে ঠেলায় চড়ে এসেছিলেন তার মালিক বসন্ত সর্দার আর শ্মশানের চণ্ডাল চিতার আগুনটা চাগিয়ে দিতে ব্যস্ত হাতে জ্বলন্ত বাঁশ লক্ষ্মীর চিৎকার শুনে আর এই ধ্বস্তাধস্তি দেখে চণ্ডাল হেঁড়ে গলায় ডাক ছাড়ল চুপ কিজিয়ে না দিদিভাই, রোইয়ে মত এই হারামিলোগ ছোড় দো উনকো গলার আওয়াজে কি ছিল কে জানে, নাকি হাতে ওই জ্বলন্ত বাঁশটা দেখেইকনস্টেবলরা ধপ করে লক্ষ্মীকে মাটিতে ফেলে দিল ওদিক থেকে ঠিক তখনই ছোটবাবু গর্জালেন,অই শুওরের বাচ্চা চল আয় গাড়ি স্টার্ট দে
লক্ষ্মী ছাড়ান পেল কিন্তু সেখানেই উপুড় হয়ে পড়ে রইল তার গায়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে, ধুলো উড়িয়ে গাড়িটা চলে গেল অপস্রিয়মান গাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওখানে উপস্থিত সবার মনে হল দুটো রক্তচোখ বিষদৃষ্টি ছড়িয়ে চলে যাচ্ছে লক্ষ্মীর চোখেও তখন ভেসে যাচ্ছে ওই রাঙা আলো
বসন্ত এসে লক্ষ্মীর কাছে এসে দাঁড়াল, ‘ দিদিভাই উঠ। কাইন্দ না। কি করবা কও। সবই আমাগো কপাল। শোক পাইলেও তোমার শ্বশুরের তো বয়স হইসিল। কিন্তু ...। উঠ উঠ। পোলা দুডারে একটু দ্যাহো। দাহ হইলে তাগো ক্রিয়াকর্ম করাইয়া নিয়া যামু নে ঘরে। উঠ, উইঠ্যা বস।’
লক্ষ্মী কাপড়চোপড় সামলে উঠে বসল। ছেলেদুটো গুটিগুটি পায়ে তার কাছে এসে দাঁড়াল – ‘মা...’। লক্ষ্মী তাদের বুকে টেনে নিয়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগল।
বসন্তের স্ত্রীও এসেছে শ্মশানে। সেও লক্ষ্মীর পাশে দাঁড়িয়ে বিলাপ করতে শুরু করল, ‘বাপের চিতাটা পুরা জ্বলতেও দিল না, নিয়া গেল। কি পাষণ্ড! তোগ চইদ্দ গুষ্টি অলাউঠা হইয়া মরব। আমি যদি সতী হই, তো মা শীতলার কিরা – মরব মরব মরব। ... তুমি কাইন্দ না বইন, দেইখ্যো।
কানাইয়ের বাপরে কিসু করব না তো মাসি! অরে ছাইড়া দিব তো?
‘ছাড়ব না ক্যান! আমরা দেখতাসি না, সেই কবে ত্থিকা, দেবুর মতো শান্তশিষ্ট পোলা আর আসে নিকি? কি করল হে? আগে ঘরামির কাজ করত। কিসুদিন তো তোমাগো অইখানে দোকান দিয়াও চলছে। তারপরে ধরল প্যান্ডেল বানানির কাম। কই কোনোদিনও তো কারো লগে ঝগড়া মারামারি করতে দেখি নাই।’
‘কিছু না কোনোদিন না মাসি। আমার লগে কোনোদিন খারাপ কথা দুইটাও কয় নাই। থানায় গিয়া দারোগারে কইলাম। শুনে না। কইল, ক্যাম্পে যা। আমারে কয়, তোরা বাংলাদেশী। যত কই আমার জন্ম ওদালিতে আর হে হইসে গিয়া যমুনামুখের পোলা, মানেই না। খালি কয়, কাগজ লই আহ। সেই গুরি ত্থিকা অইখানে আসিলাম। কাছে পিঠে ইস্কুল নাই, পড়াও হইল না। লংকা পেরাইমারিতে দিসিল বাবায়, কিন্তু আসা যাওয়ার পয়সা নাই। চাইর কেলাস পর্যন্ত পইড়া আর গেলাম না, ঘরের কাম শিখলাম। হেরে দেখসি পান বিড়ির দোকান দিতেঘর বান্ধনের সুখে পলাইয়া আইলাম হ্যাগো ঘরে, তোমাগো পাইলাম। মাসি তুমি তো সেই সবই জানো।….  
হ্যারে ছাড়ানের লেইগ্যা মার হাতের একটা চুরিও দিলাম, অসুইরা বেটায় নিল হাত পাইত্যা। কিন্তু পরের দিন যাইয়া শুনি, কানাইয়ের বাপরে ক্যাম্পে চালান করসে। আমি কোটে গিয়া কাগজ দেখাইলে তবে ছাড়ব।
আমি কাগজের কি জানি মাসি। পোলাপান দুইটারে বড় করনের লেইগ্যা দিনে রাইতে কত কষ্ট করি। হ্যাগো বাপেও ঘুইরা ঘুইরা কাম করত। পুজা হউক বা মেলা – প্যান্ডেল বানানির কামে ডাক পড়ত। ফিরা আইত যখন বাপের লেইগ্যা ওষুধ, পোলাগো জামাকাপড় আমার লেইগ্যা গন্ধ পাউডার আনত। কিন্তু...’
বসন্তের স্ত্রী তাকে সান্ত্বনা দেয়, ‘সেইসব কথা জানিই রে বইন। ঘরে ফিইরা বুড়ার টেরাঙ্কের ভিতর দেখিস, কিসু পাইতে পারস। হেই কাগজ দেখাইয়া সোয়ামিরে ছাড়াইয়া নিয়া আইতে পারবি তুই জানি। ... কিন্তু দেবুর তো ছাদ্দের আগেই আইতে লাগব। হ্যারা ছাড়ব না? তুই কবি গিয়া। ছাড়ব ছাড়ব। কাগজটা নিয়া গিয়া দেখাইলে ঠিক ছাড়ব।’
‘ না মাসি, জিগাইসিলাম বাবারে, নিজেও খুজছি বহু, কোন কাগজ নাই। বাবায় অবশ্য কইসিল, কাগজ সবই আসিল – পাঁচ সনের বন্যায় সব গ্যাসে। হ মাসি, সেই রাইতের কথাও মনে আসে। হুরহুরাইয়া জল ঢুকল। কানাইয়ের বাপ প্যান্ডেল বানাইতে গ্যাসে পান্ডু। আমি একলা ওই আন্ধাইরের মইদ্যে বাপ আর পোলা দুইটারে লইয়া বান্ধে উঠসিলাম। দুইদিন পরে অগো বাপ আইসিল। জল নামনের পরে তো কেউ কিসসু আইয়া পাই নাই। আসলে আমি তখন প্রাণ বাচামু না কাগজ!’
‘দিদিভাই ঘরে চল। এইখানের কাম শ্যাস। অস্থিটা পড়ে আইসা লমুহনে – খুড়ার শ্যাস চিন্ন, ঘরে রাখবা, পরে মা গঙ্গারে দিয়া দিবা’—বসন্ত এসে দাঁড়ানোয় তাদের কথায় বাধা পড়ল। কখন যে সময় বয়ে গেছে লক্ষ্মী বা বসন্তের স্ত্রী খেয়াল করেনিওরা উঠল। সঙ্গের দু-চারজন যারা এসেছিল তারা একটু আগে এগিয়ে গেছে। বসন্তের স্ত্রী বাচ্চা ছেলেদুটোর হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল শ্মশানের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে, পাশে লক্ষ্মী।
(৩)
অবসন্ন মনে লক্ষ্মী নিজেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলেছে।
জলজ্যান্ত খেটে খাওয়া মানুষটাকে বিনা কারনে জেলে ভরিয়ে রাখলে কারই বা ভালো লাগে! তাদের এমন সঙ্গতি নেই যে মাতব্বর কেউ সাহায্য করবে এই বিপদে। তাছাড়া এ জায়গাটার এমন কিছু নামডাক নেই যে মাতব্বরেরা এখানে অহরহ যাতায়াত করেনতবু আলতাফ জুটে গেল, দেবুর সঙ্গে একসময় ঘরামির কাজ করত।
কতদিন থেকে সুধেন্দুমোহনের পরিবার এখানে আছেন? হ্যাঁ, তা বছর দশেক তো হবেইতার আগে রিলিফ ক্যাম্পে, তার আগে নেলির ভেতরে একটি গ্রামে, তার আগে লংকা এন. এরিয়ায়, তারও আগে যমুনামুখে, তার আগে...? না, আর জানা নেই লক্ষ্মীর। যমুনামুখে থাকতেই তার শাশুড়ি মারা গিয়েছিলেন। বলতে গেলে কানাইয়ের বাপ তার বাপের কোলেপিঠেই মানুষ। কাজের খোঁজেই সুধেন্দুমোহন যে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, সেটা লক্ষ্মী কানাইয়ের বাপের মুখেই শুনেছে। পালিয়ে বিয়ে করে তো তারা দুজনে ওই নেলিতেই চলে গিয়েছিল। ঘরের অবস্থা ছিল চলনসই। বিয়ের পর টাকাপয়সা ভালোই আসছিল সংসারে। তিনি বলতেন, সত্যিই লক্ষ্মী এসেছে তাঁর ঘরে। কিন্তু একটা অ্যাক্সিডেন্টে সুধেন্দুমোহনের পা ভেঙে যাওয়ায় সব ওলটপালট হয়ে গেল।
বন্যার পর থেকে তো এখানেই। মাঝে চল্লিশটা দিন শুধু রিলিফ ক্যাম্পে কেটেছে। তাগিদ ছিল না কখনই। তবু একদিন দুজন দিদিমণি আর একজন মাস্টারমশাই এসে নাম-ধাম লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন। গতবার ভোটের সময় কানাইয়ের বাপ এসে বলেছিল, এবার ভোট দিতে যেতে হবে। কিন্তু ফিরে আসতে হয়েছিল ভোট না দিয়েই। সকাল থেকে লাইন দিয়ে ইসকুলের ভেতরে ঢোকার পর সাদা জামা পরা লোকটা জানিয়েছিল কানাইয়ের বাপ আর সে নাকি ডি-ভোটার! নামটা তারা প্রথম শুনেছিল। বাইরে দাঁড়ানো লাইনের অন্য লোকেরা বলেছিল, কোর্টে গিয়ে ব্যাপারটার ফয়সালা করে নিতেকিন্তু ওই পর্যন্তই। সুধেন্দুমোহনকে ব্যাপারটা এসে জানানোয় তিনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়েছিলেন বেশ কিছুক্ষণ। কেউ বাড়িতে এলে তাদের জিজ্ঞাসা করে ব্যাপারটা ঠিক করা যায় কিভাবে, তা হয়ত ভেবেছিলেন – কাজের কাজ কিছু হয়নি।
সবকিছু শুনে আলতাফ লক্ষ্মীকে আশ্বাস দিয়েছিল, সে-ই তাকে নিয়ে গিয়েছিল শঙ্করনগরে। রবিন উকিল তামুল চিবোতে চিবোতে আর পিক ফেলতে ফেলতে যা বলল তার সারমর্ম হল ভোটার লিস্ট লাগবে তাও আবার একাত্তরের আগের। স্কুলের সার্টিফিকেট হলেও চলবে – মানে এমন কোন একটা সরকারি কাগজ, যা একাত্তরের আগের।
কানাইয়ের বাপের জন্মই হয়েছে আশি সনে আর তার বিরাশি – কেউই স্কুলের পড়া শেষ করেনি, তাই সার্টিফিকেটও নেই। লক্ষ্মীর বাবার কাছে কি কাগজ আছে তা জানা নেই, কিন্তু সুধেন্দুমোহনেরও তো নেই কিছু।
তবু তাঁর শেষ সম্বল পাঁচটা একশো টাকার নোট লক্ষ্মীর হাতে তিনি তুলে দিয়েছিলেন উকিলবাবুকে দেবার জন্য। আলতাফ সেখান থেকে একশো টাকার একটা নোট চেয়ে নিয়েছিল। সেজন্যই বোধহয় এবার জানা গেল যে, যমুনামুখের একটি কেন্দ্রে ১৯৫১ সালের ভোটার লিস্টে দুজন সুরেন ঘোষের নাম পাওয়া গেছে। তার একজনের পরিবারে সুধেন্দু, ভবেন্দু, রাধারানি ইত্যাদি নামগুলো আছে। রাধারানি ঠিক আছে কিন্তু ভবেন্দু কে?!! লক্ষ্মী জানে না। কিন্তু এবার এমন কাগজ চাই যেটাতে বোঝা যাবে যে এই সুরেন ঘোষই সুধেন্দুমোহনের বাবা সুরেন্দ্রমোহন। ফ্যাকড়া আরও আছে। দ্বিতীয় সুরেন ঘোষের ছেলে হিসাবে সুধেন্দ্র, বয়স ২২ লেখা রয়েছে। বয়সটা মিললেও সুধেন্দ্র আর সুধেন্দুতে পার্থক্য আছে। আগেরটাতে আবার বয়স মেলে না। অতয়েব কি করা?
মাত্র চারশ টাকায় এত কিছু বলা রবিন উকিলের বদান্যতা মাত্র – জানিয়েছিল আলতাফ, ‘শুনেন ভাবীউকিলের স্বভাবই ট্যাহা খাওন। এইভাবে আপনারে জুলুম দিয়া আরও কত পাশশ যে খাইব তার ঠিক নাইআমি কই কি, আপনে আমারে, .... মানে যদি বিশ্বাস করেন, .... এই ধরেন সব মিলাইয়া তিন ... না আড়াই  দিয়া দ্যান, তবে এক্কেরে পাক্কা কাগজ বানাইয়া দিমু, আমার লোক আসে ভিত্রে তারপরে তাগো মুখের উপর ছুইরা মাইরেন কাগজখান, দেইখেন লগে লগে দেবুরে ছাইড়া দিব।’  
লক্ষ্মী এতগুলো টাকা একসঙ্গে কোত্থেকে পাবে! সে হতাশ ভাবে আলতাফের দিকে তাকায়। আলতাফ আন্দাজে বোঝে ব্যাপারটা – ‘ কিসু ভাইবেন না ভাবী। দেশইত্যা ভাইয়ের লেইগ্যা এইটা যদি করতে না পারি তো কিসের বন্দু। কাম হয়ার আগে একহাজার দিবেন। বাকিটা পরে খেপে খেপে দিলেও অইব। আমি গিয়া নে নিয়া আমু।’ একটা ফিচেল হাসি তার লালচে দাঁতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে।
লক্ষ্মী ভয় পেয়ে কথাটা বসন্তের স্ত্রীকে জানিয়েছে। বসন্ত সেদিনই তাকে সাবধান করে দিয়েছে, ‘খবরদার দিদিভাই, আলতাফরে মানা কইরা দিবা। হ্যার কথার কোন ঠিক নাই...। আর শুন, দুইদিন আগে বিপিন সারে আইসিল, কইল এন.আর.সি হইব। এই মাসের তিরিশ তারিখের ভিতরে কাগজ লইয়া যাইতে হইব ইসকুলে। তোমার যখন সেইসব বালাই নাই তখন আমারা লগে চইল্লো – কছারি গাঁওবুড়ারে কইয়া একটা বিপিএল কাট বানাইয়া দিমু।’
লক্ষ্মীর মনে হল এই কার্ডে যদি কাজ হতো তবে শশুরমশাই বানাতে বলে দিতেন আগেই। তাই সে জানতে চায়, ‘রবিন উকিল তো কইসিল একাত্তরের আগের কাগজ লাগব, কানাইয়ের বাপগো বলে একান্ন সনের কাগজ আসে কোটে, আরও পাশশ ট্যাহা দিলে সেইটা বাইর কইরা দিব। কিন্তু অত ট্যাহা তো নাই। আলতাফরেও না করতে লাগব।’
বসন্তের স্ত্রী মাঝখান থেকে ফোড়ন কাটে, ‘ওর কথা তুমি শুইনো না বইন। কাগজ যখন ওই উকিলে দিব কইসে তখন নতুন কাট বানাইবা ক্যান? হাওলাত কইরা হইলেও উকিলের ত্থিকা কাগজটা নিয়া আস।’
আরও হাওলাত!? লোকের বাড়িতে বিনে মাইনেতে খেটে দেবার কড়ারে শ্বশুরের কাজ তো তাকেই উতরে দিতে হয়েছে। সেটাও তো একরকম হাওলাত। তার নিজের ভাঁড়ার তো শূন্য। শ্রাদ্ধ আর লোক খাওয়ানো বাবদ বংশীর মুদির দোকানেও প্রায় ছশো টাকা বাকি। সেখানেও চাল বাছার কাজ করে শোধ দিতে হবে। হাতের কাজে তার সুনাম আছে বলেই টিঁকে আছে এখন পর্যন্ত।
লোকে বলে, লক্ষ্মীর হাতের ছোঁয়ায় জাদু আছে। কিন্তু সব হারিয়ে তার চারদিকে এখন অন্ধকার। এমন কোন জাদু তার জানা নেই যে কানাইয়ের বাপকে সে আগের মতো করে পাবে বা এন.আর.সি-র জন্য দরকারি কাগজটা সে এখুনি ছুমন্তর করে পেয়ে যাবে হাতের কাছে। সে জানে সবকিছুই সে হারিয়েছে। তার মন বলছে, অবস্থা বদলাচ্ছে – আগের মতো নিশ্চিন্তে আর থাকা যাবে না। সুধেন্দুমোহনের বয়স হয়েছিল, এমনিতেই হয়ত তিনি মারা যেতেন। অথচ হাওয়ায় ঊড়ছে, ছেলে-বউএর ডি-ভোটার হবার খবর তাঁর মরণ ডেকে এনেছে। কোনটা সত্যি আর কোনটাই যে মিথ্যে তা ঠাহর হয় না লক্ষ্মীর।
এরকম অবস্থায় নিজের লোক ভেবেই বসন্ত তাকে উদ্ধার করতে চেষ্টা করে, ‘নাইলে একটা কাম করো দিদিভাই। বাপের কাসে ফিইরা যাও। যদি কোন সাহায্য তিনি করতে পারেন...... আর যদি কোন কাগজ পাও তো লইয়া আইতেও পারবা।’
হায় রে বাপের বাড়ি!! আজ কত বছর বাপের মুখ দেখেনি লক্ষ্মী! সেখানে এতদিন কী ঘটেছে, কে কোথায় কী করছে, কিছুই তার জানা নেই। মায়ের চুরি দুগাছা সম্বল করে পালিয়ে আসার পর আর যোগাযোগ করার সাহসও হয়নি। দু-একবার কানাইয়ের বাপ চেষ্টা করেছিল, বিশেষ করে কানাইয়ের জন্মের সময়। কিন্তু লোকমুখে বাপের রাগের কথা শুনে আর সাহস হয়নি। এখন কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে?
কিন্তু এদিকের খবরটাও তো দেওয়া দরকার। বসন্ত আর তার স্ত্রী তাকে বারবার একথাই বুঝিয়েছে। এখন তো আর কানাইয়ের বাপের পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। সে ওই ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখদুটো দিয়ে শেষ মুহূর্তে কী বোঝাতে চেয়েছিল, লক্ষ্মী জানে না। হয়ত বলতে চেয়েছিল, ‘লক্ষ্মী, তুই পালা’ বা হয়ত বলতে চেয়েছিল, ‘তুই মর – ওরা তোরে বাইচা থাকতে দিব না।’
থানা থেকে এসে তাকে নিয়ে যাবার আগে লক্ষ্মী ঘটনার গভীরতা সম্পর্কে কোন আঁচ পায়নি। তাকে বলা হয়েছিল, দেবেন্দ্রকে ছেড়ে দেওয়া হবে – তাকে ফেরত নিয়ে আসার জন্যই লক্ষ্মীকে ক্যাম্পে যেতে হবে। কানাইদের বসন্ত সর্দারের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে সে প্রায় দৌড়েই চলে গিয়েছে ক্যাম্পে। বসন্তের স্ত্রীকে বলে আসার কথাও তখন মনে পড়েনি।
হ্যাঁ, কানাইয়ের বাপকে লক্ষ্মীই শনাক্ত করেছে। আগের রাতে সে নাকি সিলিং থেকে ঝুলে পড়েছিল।.....  
এখন রাস্তায় ঘষটাতে ঘষটাতে, বৃষ্টির ছাঁটে ভিজতে ভিজতে সে নিজেকে শনাক্ত করতে চাইছে।
--------------------