Thursday 7 July 2011

হাসির ছবি প্রদর্শনী

১ম পর্ব: চায়ের কাপ হাতে নিয়ে কাগজটায় চোখ রাখতেই একটা বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে গেল প্রবুদ্ধর। ডিস্ট্রিক্ট আর্ট গ্যালারিতে হাসির ছবি প্রদর্শনী আজ দুপুর বারোটা থেকে। এমনিতে ছবি দেখার পোকা নয় সে। কিন্তু বিজ্ঞাপনটা পড়ে মনে হল অনেকদিন প্রাণখুলে হাসেনি। ছবি দেখে যদি একটু হেসে নেওয়া যায় মন্দ কি ? তাড়াতাড়ি চা-টা শেষ করে করবীকে বাজারের ব্যাগ আর টাকা এগিয়ে দেবার জন্য ডাকল। বলল, শুনছ আজ দুপুরে চলো আর্ট গ্যালারিতে যাই। বেশি রান্নাবান্নার দরকার নেই। মাছের ঝোল আর ভাত। বিকেলে ফেরার সময় না হয় চপ-টপ কিছু কিনে আনা যাবে। সকাল সকাল এমন একটা বিদঘুটে আব্দার শুনে মেজাজটা চড়ে গেল করবীর। প্রবুদ্ধকে শুনিয়ে শুনিয়ে ছেলেকে বলল, ওই শোন তোর বাবা বোধহয় খেপেছে। ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই দুপুরে বেড়াবার ডাক ছেড়েছে। তাও কোথায়, না আর্ট গ্যালারিতে। উফ্ কী শখ ! যদি সিনেমা যাবার কথা বলত, তাও একটা কিছু বুঝতাম। না একেবারে আর্ট দেখাবে ! প্রবুদ্ধ কিছু বলার চান্সই পেল না। করবীর কথার তোড়ে ভেসে গেল। ছেলে আর মেয়ে তো বাবার এই উদ্ভট প্রস্তাব শুনে পাশের ঘরে হেসেই খুন। ব্যাগ আর টাকা দিতে এসে করবী আবার বলে, হঠাৎ আর্ট গ্যালারিতে নিয়ে যাবার শখ হল কেন বলো দেখি ? ওটা একটা ঘোরার জায়গা হল ? লোকে ছুটির দিনে বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে বিকেলে কি সন্ধ্যায় বেড়াতে বেরোয় – বাজারে যায়, মলে যায় বা পার্কেও যায় অনেকে। তোমার তো ওসব বালাই নেই। যা-ও বা বহুদিন পর শখ গজালে, তা-ও কোথায়, না ভর দুপুরে আর্ট গ্যালারিতে। ওখানে ভদ্দরলোকে যায় ! দেখেছি না আগে। দুটো ঘর জুড়ে কয়েকটা মাথামুণ্ডু লাল-নীল-হলুদ ছবি। ওগুলোর সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটা লোক এমন মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে যেন সব বুঝে ফেলেছে। আমার বাবা বলতেন, কার যেন তুলি মোছার কাপড়কেই দারুণ ছবি বলে ক্রিটিকরা বাহবা দেওয়ায় উনি ফাঁপড়ে পড়েছিলেন। শোনো, ওসব ভূত মাথা থেকে নামাও। বাজারে যাও। সবজি যা পারো নিয়ে এসো, আর দয়া করে চেনা দোকানদারের কাছ থেকে পচা মাছটি উঠিয়ে এনো না। প্রবুদ্ধ হাত বাড়িয়ে ব্যাগ আর টাকা নেয়। চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগে বলে, গেলে কিন্তু ভালো হত। অমনি হাতা-খুন্তি-সাঁড়াশির কনসার্ট শুরু হল যেন। আওয়াজের তীব্রতায় পাশের ঘর থেকে মনি-সুবুরা দৌড়ে চলে এল – কি হল মা ? আরে দ্যাখ না, রোববারটা কোথায় সবাই মিলে বসে আরাম করে খাওয়া-দাওয়া করব – তোর বাবার বরোটার সময় আর্ট দেখাতে নিয়ে যাবার ভূত মাথায় চেপেছে। রোজ সকাল-সকাল রান্না হয়। আজ একটা দিনও কি নিস্তার নেই ? বাইরে বাইরে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াও তো বোঝ না। মেয়েদেরও একদিন রেস্ট চাই। উঠল বাই তো কটক যাই। মাছ-ভাত খেয়েই উনি বেড়িয়ে পড়বেন। যতসব আদিখ্যেতা। মনির আর্টের স্কুল আছে, সুবুর সামনে পরীক্ষা। দিদির বাড়ি কতদিন যাই না। ভাবলাম তোর বাবাকে নিয়ে আজ একটু ঘুরে আসব। কতদিন ওদের দেখি না। মা, আমার আর্টের ক্লাস থেকে ফিরতেই তো দেড়টা বাজবে। তোমরা বারোটায় গেলে কী করে হবে ? তাছাড়া বাবা বলেছিল বিকেলে বিশালে নিয়ে যাবে। মনিকে বাধা দিয়ে সুবু বলে,-- না বিগ বাজারে যাব। স্টার ওয়্যার আলটিমেটের সি.ডিটা ওখানে আছে শুনেছি। আর ফেরার সময় চিকেন-চিজ প্যাটিস খেয়ে আসব। যা টেস্টি না। বোন তুই একবার খাস। গত মাসে তো শুধু পচা রঙের গোল্লা খেয়েই কাটালি। তুই চুপ কর তো। ওটা চিকেন না গরুর মাংস তুই জানিস? আর প্যাটিস তো … ওয়াক্ থুঃ। শক্ত শক্ত। ওটা একটা খাবার হল ? বিশালে মনজিন্সের কর্ণার খুলেছে। বাবা ওখানে কেক খাওয়াবে বলেছে। তাই না বাবা ? – বিগ বাজারেও তো ফিফটিন্থে সুগার অ্যান্ড স্পাইস্ কর্ণার খোলার কথা ছিল। দেখি বাবা, পেপারটা দাও তো। ওপেনিঙের নিউজটা দিল কি না দেখি। প্রবুদ্ধর বিশেষ কোনো উৎসাহ ছিল না মনজিন্স বা সুগার অ্যান্ড স্পাইসের কেক-এ। সুবু কাগজটা তার হাত থেকে ছোঁ মেরে নিতেই সে চেঁচিয়ে ওঠে – এই, ছিঁড়ে ফেলিস না দেখিস। ওতে দরকারি কথা আছে। মনি জিজ্ঞেস করে – কী দরকারি কথা, বাবা ? – ও তোরা বুঝবি না। করবী ততক্ষণে চায়ের টেবিল ছেড়ে ফ্রিজ থেকে সবজির বাস্কেট নিয়ে রান্নাঘরে সরে গেছে। ছেলে-মেয়ে আর বাবার যুগলবন্দী কানে গেলেও আমল দিল না। সুবু-মনি কিন্তু বাবাকে চেপে ধরল। – বলো না বাবা, কী দরকারি কথা আছে। কোন পেজ-এ আছে ? – তোরা বুঝবি না, বললাম না। ওসব বড়দের কথা। প্রবুদ্ধও টেবিল ছাড়ে। তারপর হাল্কা ভাবে বলে,– একটা হাসির ছবির কথা। ছোট্ট করে কথাটা বলেই সে গলা তোলে, – আমি বাজারে গেলাম। শেষ কথাটা যে করবীকে উদ্দেশ্য করে বলা তা সুবু-মনি বোঝে, করবীও। সুতরাং রান্নাঘর থেকে তার গলা শোনা গেল – ক’টা মাঝারি সাইজের চিংড়ি পেলে নিয়ে এসো। চিঁড়ের পোলাও বানিয়ে দিদির বাড়ি নিয়ে যাব। ওরা খুব খুশি হবে। প্রবুদ্ধর কানে যায় কথাটা। মুখে কিছু না বললেও জামাটা গায়ে গলাতে গলাতে সে নিজের মনেই গেয়ে ওঠে – তোমারো পরাণো যাহা চায়, তাই হোক, তা-ই হোক গো.......। তার দীর্ঘ নিশ্বাসটা রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছয় না। এবার সে কামদা অ্যাপার্টমেন্টের বি ব্লকের ফ্ল্যাট নাম্বার থ্রি জিরো ওয়ানের করবাবু ওরফে ‘কামদা’র পেবোদা হয়ে বাজারে বেরোয়। বন্ধ দরজার ওপারে রয়ে যায় মনি-সুবু-করবীর ঝাঁপতাল সহযোগে আনন্দরাগিণী। ২য় পর্ব: ঘড়িতে তখন ঠিক সাড়ে তিনটে। ইডেনে নাইটদের খেলাটা শুরু হবো-হবো। করবী শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে টি.ভি-র ঘরে এল – কই গো, এখনও খেলা দেখছ যে। জামা-কাপড় পরো। আমরা তো রেডি। অ্যাই সুবু, বসে আছিস যে। যাবি না মাসির বাড়ি ? ওঠ্। সুবু বলে, – দাঁড়াও না। খেলা শুরু হবে এখ্খুনি। তোমরা যাও, আমি পরে যাব। করবীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল, – পরে যাবি মানে ! একা একা কীভাবে যাবি অতদূর ? তোকে আমি একা ফেলে যাবই না। তাহলে ফিরেও দেখব টি.ভির সামনে পড়ে আছিস। পড়বি না তো এক ফোঁটাও। যদি পড়তিস, তাহলে বুঝতাম। চল্ চল্। মাসির বাড়ি গিয়ে টি.ভি দেখিস। অগত্যা রাগতভাবেই সুবুকে বিছানা ছেড়ে উঠতে হল। প্রবুদ্ধও জানত সুবুর রেজিস্টেন্সটা দুর্বল। করবী-ঝড়ে ছিটকে গিয়ে ওয়াড্রোবের সামনে পড়বে। তারপর একটানে পুরনো রঙ চটা নীল জিনস্ আর লাল-সাদা ডোরা কাটা টি-শার্টটা বার করে আনবে, দড়াম করে ওয়াড্রোবের দরজাটা বন্ধ করবে – উপহার হিসাবে পাবে মায়ের চোখ রাঙানি, কিন্তু দেখেও দেখবে না। এরপর পায়ে চটি গলিয়ে সোজা চলে যাবে ফ্ল্যাটের বেসমেন্টে। সবই হল। এবার তার পালা। অন্যদিন হলে এই উপলক্ষে একটা প্রশংসাবাক্য শোনা যেত স্ত্রীর মুখে। কিন্তু একে দিদির বাড়ি যাওয়ার আনন্দ, তায় দুপুরে রসনার পরিপূর্ণ তৃপ্তি। তাই বোধহয় একটু মলয় বাতাস বয়ে গেল – যাও, আজকে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবিটা পরে নাও। খেলা পরে এসে দেখে নিও। জ্যাম ঠেলে সুবুদের মাসির বাড়ি অটোতে আধ ঘন্টা। বাসে খরচা একটু কম হলেও আজ দিদিকে সপরিবারে সারপ্রাইজ দেবার জন্য ঢাউস টিফিন ক্যারিয়ার সঙ্গে আছে। লিফটে নামবার সময় মনি ওটা নিয়ে প্রায় কাত হয়ে গেছে। প্রবুদ্ধ অটোতে বসে করবীকে জিজ্ঞেস করল, – কী কী নিলে ? – কোথায় আর নিতে পারলাম। একটা বড় হটকেস কিনলে ভালো হত, জানো। কী অসুবিধে করে যে এ-ক’টা নিয়ে এলাম। ঢাকনাটা ভালো করে আটকায় না। বাটিগুলো ছোট ছোট। ভাজাগুলো আঁটেই না। একবার বিগ বাজারে বড় হটকেস দেখেছিলাম। ওরকমটা হলে ভালো হত। মনি বাবার অবস্থাটা বোঝে, – মা, তুমি না যেন কি ! বাবা জানতে চাইল, কী কী নিয়েছ। করবীর হুঁস ফেরে – বলছি তো দাঁড়া না। বেশি কথা। … তারপর প্রবুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলে, – কী নিলাম? এই তো, দু-বাটি ফ্রায়েড রাইস। বাসমতীটা আনলে তো, ভাবলাম এনেছো যখন এটা দিয়েই করে ফেলি। পুরো প্যাকেটটাই রেঁধে ফেলেছি চিংড়ি বাদাম-টাদাম দিয়ে। একটু রেখে এসেছি – রাতে টেস্ট কোরো। আর কয়েকটা ইলিশ মাছ ভাজা, দিদিরা কাল ঝোল রেঁধে খেতে পারবে। আর তো মাত্র একটা বাটি। ওটাতে মাংস এনেছি। মিমিটা খুব ভালোবাসে। ব্যাস, এই তো। মনি ওধার থেকে ফোড়ন কাটে – বাবা, মা কিন্তু মাংসের ঝোল আনেনি, আলুও নয়। আর বাড়িতে ইলিশ-চিংড়ির স্টক ফিনিস। এর সঙ্গে যোগ হয় সুবুর টিপ্পনি – মা আমাদের ফিমেল কর্ণ। ফলে করবী রেগে গেল। রাগাটা স্বভাবিক। বাকি বাড়ির লোকগুলো কি না খেয়ে রয়েছে। সবসময় নজর এত নিচু কেন। জামাইবাবু দূরে থাকেন। সবদিন তো দিদি আর মিমি ভালো-মন্দ খাচ্ছে না। একটু না-হয় দেওয়াই হল। বাড়িতে তো প্রায়ই এটা ওটা খাওয়া হয়। তখন কি ওরা খেতে আসে না হাত বাড়িয়ে চাইতে আসে। কিন্তু রাগটা বেড়ে চলার বদলে থেমে গেল। কারণ অটোটাও দিদির বাড়ির সামনে থেমে গেছে। ভাড়া চুকিয়ে দোতলায় ওঠার মুখে প্রবুদ্ধ জিজ্ঞেস করল, – ফোন করে দিয়েছিলে তো ? – ফোন করব কেন। এমনি দিদির বাড়ি আসা যায় না! তাছাড়া ওরা জামাইবাবু এলেই কোথাও বেরোয়। দু-দিন বাড়িতে থাকে – হয় সিনেমা নয় অন্য কোথাও নিয়ে যায়, মল-টলেও ঘুরে আসে। ওরা বেশ ভালোই আছে। ঘুরুক, সব তো আর আমার মতো কপাল না। এর মধ্যে ছেলে-মেয়ে দুটো ওপরে উঠে গিয়েছিল। ওরাই সিঁড়ির মুখ থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে খবরটা দিল, – মা, তালা। – কী বলছিস ! ভালো করে দেখেছিস তো। কড়া নেড়ে দ্যাখ। বলতে বলতে করবী ওপরে উঠে গেল। প্রবুদ্ধর বুকে একটু আশার আলো খেলে গেল। স্ত্রীর পেছনে সে-ও দোতলায় উঠে দরজার মুখে দাঁড়াল। সত্যিই একটা বড় গোদরেজ তালা ঝুলছে। কোথায় গেল ওরা ? করবী সুবু-মনিকে বকতে শুরু করে দিল, – তোদের জন্য। সেই সকাল থেকে আসব না আসব না করছিলি। প্রবুদ্ধকে বাধা দিতে হয় – এখন চুপ করো তো। চলো, আরেকদিন আসা যাবে। – দাঁড়াও, এগুলো কী করব ? – নিয়ে চলো। কোথায় আর বসবে। কোথায় গেছে, কখন ফিরবে, কিছুই তো জানো না। সুবুরাও সায় দিল টিফিন ক্যারিয়ারটা ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। রাতের খাওয়াটা বেশ জমবে তাহলে। করবী, দাঁড়াও তো, বলে পাশের ফ্ল্যাটের ডোরবেল টিপল। মিনিট দুয়েক পর এক ভদ্র মহিলা দরজা খুলে বাইরে উঁকি মারলেন । প্রথমটা ঠিক বুঝলেন না আগন্তুকরা কারা। তারপরই, – ওমা করবী যে ! কতদিন পরে দেখলাম ! আজকাল কম আসো দিদির বাড়ি। তা তোমার দিদি তো এই একটু আগে বেরোল। আমার বউমাও সঙ্গে গেছে। চারতলায় রায়বাবুর ছেলের কাল অন্নপ্রাশন। ওই একটু গিফট্ কিনবে আর মিমিদের কোন বান্ধবীর বাড়ি যাবে। আমার নাতনিটাও একসঙ্গে পড়ে কি না। তা তোমরা কি একটু বসবে ? মনি তো একদম রাজি নয়, সুবু আগেই নীচে নেমে গেছে। ভদ্রমহিলার কথা শুনে প্রবুদ্ধর মনে হল তিনি চলে যেতেই বলছেন। কারণ এতগুলো কথা তিনি দরজা অল্প ফাঁক করে শরীরটা বাইরে বার করেই বলছিলেন। বাঁচাল করবীই। সে বলল, – না মাসিমা, বসি না আর। আমার ছেলেটারও এক বন্ধুর বাড়ি যেতে হবে নোটস্ আনতে। আপনি কষ্ট করে এটা একটু রাখবেন ? – টিফিন ক্যারিয়ারটা তুলে ধরল ভদ্রমহিলার সামনে। – দিদিকে বলবেন, মিমি আপনার নাতনি আর এ-বাড়ির বউদিকে নিয়েই যেন খায়। একটু ফ্রায়েড রাইস আর মাংস আছে। ভদ্রমহিলা খুশি হলেন মনে হল কিন্তু সেটা প্রকাশ করলেন না, – ঠিক আছে দাও। ওরা এলে দিয়ে দেব। উনি দরজার ভেতর অদৃশ্য হতেই করবীরা নীচে নেমে এল। এবার কী করা ? সুবু ঘ্যান ঘ্যান করতে শুরু করল – শুধু শুধু আই পি এল ম্যাচটা দেখা হল না। নাইটের ইমপরট্যান্ট খেলা ছিল। ফোন-টোন না করে চলে এলাম মাসির বাড়ি ! মনিরও আব্দার শুরু হল বিশালে যাবার। শুনে সুবুও চাইল বিগ বাজারে যেতে। করবী কিছু না বলে হাঁটছে। মোড় অব্দি না গেলে ফেরার বাস বা অটো পাওয়া যাবে না। মিশন আনসাকসেসফুল। তাই ওর মুখ ব্যাজার। এই পরিস্থিতিতে আর্ট গ্যালারির কথা একবার মনে উঁকি দিয়ে গেলেও প্রবুদ্ধ কিছু বলল না। হাঁটতে হাঁটতে একবার জিজ্ঞেস করল করবীকে, – সুবুর কোন বন্ধুর বাড়ির যাবার কথা বলছিলে যে, যাবে নাকি ? – কোথায় বললাম ? প্রবুদ্ধ ধরিয়ে দিল, – ওই যে ভদ্রমহিলাকে বললে না ? – ওটা কথার কথা। নাহলে মাসিমা হয়ত বলতেন বাড়ি নিয়ে যাও। তাছাড়া দিদিকে বলতে পারবেন যে আমরা অন্য কোথাও গেছি, দিদিও শুনে আর মন খারাপ করবে না। পরে দিদিকে বুঝিয়ে বলা যাবে। – তাহলে এখন কোথায় যাবে, বাড়ি ? সুবু-মনিরা বাড়ি ফিরতে রাজি নয়। ওদের শান্ত করতে শেষ পর্যন্ত বিশালে যাওয়াই ঠিক হল। বিগ বাজার আরেকদিন হবে। বাসে বাসে অত ঘোরা সম্ভব নয়। ওদের কাছে এটা নেই মামার চেয়ে কানা মামা লাভের মতো। অতএব মেনে নিল। এদের মুখে হাসি ফুটে উঠতে দেখে ভালোই লাগল। প্রবুদ্ধর মনে হল, ছোটদেরই মজা। তাদের উটকো বায়নাক্কাগুলোও বেশ মিটে যায়। বিশালে বেশি সময় লাগল না। বাসটা তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়ায় মলটাকে প্রায় ফাঁকাই পাওয়া গেল। মনির কেক খাওয়া আর সুবুর সি.ডি কেনা – দুই-ই হল। ভাগ্য ভালো স্টার ওয়ারের সি.ডিটা পাওয়া গেল। নইলে আবার একদিন বিগ বাজারে যেতে হত। করবীরও মন মেজাজ খারাপ। বিশেষ কোনো কথা বলছে না। মল থেকে বেরোতে পারলেই যেন বাঁচে। অতএব বিশাল থেকে যখন বেরিয়ে এল ওরা তখনও বিকেলের ভাবটা রয়েছে। অগোছালো ভাবে চারজন চলেছে বাসস্ট্যান্ডের দিকে। বাড়ি ফিরতে হবে। করবী তখনও চুপচাপ। প্রবুদ্ধ তাকে বোঝায়, – কী করবে মন খারাপ করে। সামনের রোববার না হয় ফোন করে সকালবেলাতেই ওদের বাড়ি যাওয়া যাবে। করবী কোনো জবাব দেয় না। প্রবুদ্ধ আশায় বুক বেঁধে বলেই ফেলে, – যাবে নাকি একবার আর্ট গ্যালারিতে ? এই তো সামনেই। পাঁচ মিনিটেই পৌঁছে যাব। করবী ‘না’ বলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু মনি আর সুবু প্রস্তাবটা লুফে নিল। অবশ্য প্রদর্শনী দেখার জন্য নয় – সামনের পার্কে বসার জন্য। করবী সায় দিল, – তাহলে তুমি দেখে এসো, আমরা বাইরে পার্কে বসে থাকব। কতক্ষণ লাগবে তোমার ? প্রবুদ্ধ এই প্রস্তাবে রাজি হল না। বলল, – গেলে একসঙ্গেই যাব। তোরাও মজা পাবি, হাসির ছবি তো। – হাসির ছবি ? সেটা আবার কেমন ? – চল্ না। গেলেই তো দেখবি। আমি তো আর দেখিনি, কাগজে বিজ্ঞাপন দেখলাম সকালে, তাই বললাম। করবী জিজ্ঞেস করল, – হাসির ছবি প্রদর্শনী হয় নাকি ? হাসির ছবি মানে তো কার্টুন। কার্টুন এক্সিবিশন্ বলো তাহলে। – মিকি মাউস না আর. কে ? সুবু জিজ্ঞেস করে। – কার কার্টুন বা ছবি তাতো জানি না। বিজ্ঞাপনে দেখলাম। তাই বলেছি। এখন তোরা গেলে চল, না গেলে বাড়ি যাবার বাস ধরি। এ-কথায় কাজ হল। সবাই মিলে বাসে উঠল। সন্ধের আগেই পৌঁছে গেল গ্যালারিতে। ৩য় পর্ব: বড় হলঘরের তিনদিকের দেওয়াল জুড়ে সারি সারি মাউন্ট করা ছবি। প্রত্যেকটার নীচে একটা করে নাম দেওয়া আছে। ছোট ছোট আলোগুলো এমন ভাবে সাজানো যে আঁকা ছবিগুলোকে মনে হচ্ছে জীবন্ত। কোনোটা জল রঙের, কোনোটা তেল রঙের আবার কোনোটা শুধু পেন্সিলের স্কেচ। নানা রকমের মুখ বা মুখের আদল। ছবিগুলোর মাঝে মাঝে দেওয়ালে আবার মজার আয়না লাগানো। মনিরা সবাই আয়নায় নিজেদের চেহারা আর অদ্ভুতদর্শন ছবিগুলো দেখে খুব হাসছে। করবীও। প্রবুদ্ধও দেখছে ছবিগুলো। সবগুলোতেই হাসির ব্যাপার আছে বলে তার মনে হচ্ছে না। কয়েকটা তো মনে হচ্ছে আগে কোনো ম্যাগাজিন-ট্যাগাজিনে দেখা। ঘুরতে ঘুরতে একটা ছবির সামনে প্রবুদ্ধকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। আরে ছবিটার নীচে ‘পেবোদা’ লেখা আছে ! – প্রবুদ্ধ আশ্চর্য হয়। তার নামে ছবি ! দেহটা বড় মাথাটা ছোট ছবির লোকটার। একখানা জ্বলন্ত উনুনের উপর বসে হাসছে। মাথাটা প্রবুদ্ধর কেমন ঘুলিয়ে গেল। একটা হাত এসে তার সঙ্গে করমর্দন করল। সে চোখ তুলে দেখল, ছবির লোকটা ! চারদিকে তাকিয়ে দেখল প্রবুদ্ধ – কিছু ভুল হচ্ছে না তো ? করবীরা একটু দূরে কার্টুন দেখে হাসছে। সব ঠিকই তো আছে। ছবির লোকটা ততক্ষণে হাত ছেড়ে দিয়ে খুব হাসছে। – কি, কেমন লাগছে এক্সিবিশন ? অনেকদিন তো প্রাণখুলে হাসোনি। এবার হাসি পাচ্ছে তো ? আমতা আমতা করে প্রবুদ্ধ ওর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে – কিন্তু নিজের কার্টুন দেখে কার হাসি পাবে! – নিজের ছবি ! কোথায় ? এটা তো আমার ছবি। অবশ্য এ-ছবি যদি কেউ নিজের বলে ভাবে তাতে আপত্তি নেই। আর নিজের ছবি দেখে হাসতে পারলে এর মতো মজা আর কোথাও পাবে না। বুঝেছ। মজাটি শুধু চারদিক দেখেশুনে খুঁজে বার করে নেওয়া। ব্যাস্। কেল্লাফতে। – কীভাবে মজাটা খুঁজব? – প্রশ্নটা প্রবুদ্ধ যেন নিজেকেই করে। তবে উত্তরটা আসে ছবির ভেতর থেকে, – নিজের খুঁতটা খুঁজে নাও। ভাবো সেটা তোমার ভেতরের পেবোর খুঁত। এই পেবোটা কিন্তু অন্য লোক – এই যেমন আমাকে দেখছ। আমি তুমি নই আবার একরকম তুমিও। আমার ছবি দেখে তুমি থমকে দাঁড়াচ্ছ আবার হাসছ। একটু পরে তোমার বউ ছেলে-মেয়েও হাসবে। দুনিয়া অন্যের খুঁত দেখেই হাসে, মজা পায়। তুমিও পেবোকে অন্য মানুষ হিসাবে দেখ, জীবনে আসল মজা পাবে। এর জন্য প্র্যাকটিস দরকার। শেষের কথাটা কানে দুবার বাজল। প্রবুদ্ধ দেখল ছবির পেবোদা তেমনি দাঁত বার করে উনুনের ওপর বসে আছে। পাশ থেকে করবী সুবু-মনিকে বোঝাচ্ছে এরকম কার্টুন আঁকতে বহু প্র্যাকটিস দরকার। ওরা যে চলে এসেছে খেয়াল হয়নি প্রবুদ্ধর। সে করবীকে জিজ্ঞেস করে, – বাড়ি যাবে না ? – দাঁড়াও অনেকদিন এভাবে হাসিনি। আরেকটু থাকি। ছবির নামটা নজরে আসতেই মনি চেঁচিয়ে ওঠে – দাদা দ্যাখ, বাবার নামে কার্টুন। করবী-সুবু ‘পেবোদা’ লেখা কার্টুনটা দেখে হাসতে হাসতে প্রায় লুটিয়েই পড়ে আর কি ! প্রবুদ্ধ হেসে ফেলে, বলে – এটা আমার নয়। তার মুখের অবস্থা দেখে মনিরা আরও জোরে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতেই আর্ট গ্যালারি থেকে ওরা বেরিয়ে আসে। বাসে ওঠার আগে প্রবুদ্ধ বলে, বাড়ি চলো। আজ সারাদিনে কতবার ওরকম কার্টুন হলাম দেখাব। ছবি এঁকে রাখিস তোরা। --------------------------

Wednesday 6 July 2011

শহুরে বাঘ

ফ্লাইওভারের নীচে রাস্তাটা ঘুরতেই চোখে পড়ল ধোনিকে। হ্যাঁ, সমুর দেখতে ভুল হয়নি। যদিও কয়েক সেকেন্ডই দেখা গেল চলতি গাড়ি থেকে, তবু তার চোখ ঠিকই দেখেছে। ধোনি, বাহাদুর ক্রিকেট অধিনায়ক বলছেন বাঘ বাঁচাও, ভারত বাঁচাও। এরকম আরও কয়েকটি বিজ্ঞাপনের পোস্টার অনেক জায়গাতেই লাগানো আছে। উদ্দেশ্য শহরের মানুষকে সচেতন করা। সমু ভাবে, সত্যিই তো – চল্লিশ হাজার থেকে যদি সংখ্যাটা মাত্র হাজার দেড়েকে এসে দাঁড়ায়, ব্যাপারটা বেশ চিন্তার। অন্তত পরিবেশবিদদের কাছে। কাল যখন নেহেরু পার্কে টাইগার পয়েন্টটা উদ্বোধন করতে গিয়ে মি. পারিখ কথাগুলো বলছিলেন তখন মনে হচ্ছিল সামনে সত্যিই ভীষণ বিপদ। জাভা, বালি ইত্যাদি দ্বীপগুলোতে বাঘ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সেই কবেই। সুমাত্রা, সাইবেরিয়াতেও তারা হারিয়ে যাবার মুখে। যা আছে তা ভারতে আর চিনে। এখন এদের যদি বাঁচানো না যায় তবে পৃথিবীর চেহারাটাই নাকি বদলে যাবে। সমুর মনে পড়ে গিয়েছিল স্কুলের পড়ার কথা – বাঘ না থাকলে তৃণজীবীদের বাড়-বাড়ন্ত হবে, তারা সব ঘাস খেয়ে ফেললে মানুষ বাঁচবে না। তাই বুঝি বিশ্ব জুড়ে চলছে বাঘ বাঁচানোর বিশাল যজ্ঞ। চিড়িয়াখানার কর্তা থেকে শুরু করে অনেক হোমরা-চোমড়ারাই ছিলেন কালকের মিটিং-এ। কত সব কথা। পার্কের মধ্যে যাঁরা বাচ্চাদের নিয়ে বা পুরো ফ্যামিলিসহ ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তাঁরাও মিটিং শুরুর পর একে একে এসে জড়ো হয়েছিলেন শামিয়ানা খাটানো মঞ্চের সামনে। পড়ন্ত বিকেলের পার্কে কয়েক জোড়া সদ্য বিবাহিত বা অবিবাহিত যুবক-যুবতীও ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ছিলেন এদিক ওদিকে। গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে সমুও ছিল তাদের মধ্যে। পটাপট কয়েকটা স্ন্যাপ আর তিন কলামের মতো রিপোর্ট খবরের অফিসে জমা দিলেই সেদিনের মতো তার ডিউটি শেষ। বাঘ বাঁচল কি মরল তাতে তার কিছু যায় আসে না। সম্পাদক-বাঘের হাত থেকে বাঁচতে পারলেই যথেষ্ট। অতএব মঞ্চে যে যা বলছেন তার একটা নোট নিতে সে সবুজ ঘাসের ওপর বসে পড়েছিল। কাছেই একটা দোলনা আর তাকে ঘিরে বাচ্চা ও মায়েদের জটলা। সমু শুনল একটা বাচ্চা তার মা-কে প্রশ্ন করে করে বিরক্ত করছে ‘ওমা, মা, ওই আঙ্কলটা কী বলছে মা? ব্যাগ্র কী মা?’ মা-টি তাকে বোঝালেন, ‘আঙ্কলটা টাইগারের কথা বলছে, তুমি দেখেছো না জাঙ্গল বুকসে শের খানকে।’ ‘শের খান কী করেছে? আঙ্কলরা কি শের খানকে বকছে? শের খান কি এখানে আসবে? শের খানকে কি ওরা মেরে ফেলবে?’ ইত্যাদি নানা প্রশ্নে সে তার মা-কে বিব্রত করে তুলছিল। ভদ্রমহিলা শেষ পর্যন্ত তাকে বকে থামিয়ে দিলেন, ‘চুপ করো তো। নইলে ওই যে টাইগার দুটো আছে, এসে কামড়ে দেবে, তখন বুঝবে।’ সমু তাকিয়ে ছিল ভদ্রমহিলার দিকে। ওর কথা শুনে শামিয়ানা ঘেরা জায়গার দিকে চোখ ফিরিয়ে দেখল সত্যি দুটো বাঘ দু-পাশে দাঁড়ানো। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই আসল না নকল। মনে হচ্ছিল, এখখুনি হালুম করে যদি লাফিয়ে পড়ে....। পড়তেই পারে। কম্পুটার আর ইলেকট্রনিক্সের দৌলতে পুতুলকে দিয়ে তো কত কিছুই করানো হচ্ছে। মি. পারিখ বলে যাচ্ছিলেন, ও-দুটো এখন থেকে নেহেরু পার্কেই থাকবে। বাচ্চাদের মনোরঞ্জন যেমন করতে পারবে তেমনি বাঘেদের জীবন সংরক্ষণে সাধারণ লোকেদের সচেতনতাও বাড়াতে পারবে।’ সমু ভাবছিল,ভাগ্যিস এটা পুতুল। তাই পার্কে থাকলে বিশেষ কোনও অসুবিধে হবে না। নাহলে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো দূরে থাকুক, প্রাণভয়ে সবাই পার্ক ছেড়ে পালাত। রিপোর্টে সে পারিখের এই পরিকল্পনার কথা ফলাও করে লিখল বটে, কিন্তু এতে সচেতনতা কতটা বাড়বে সেটা নিয়ে তার একটা ধন্দ রয়ে গিয়েছিল। তবে আমোদ যে পুরো মাত্রায় হবে সে-বিষয়ে সমুর মনে কোনও সন্দেহ ছিল না। তাই ছোট্ট করে নেহেরু পার্কে এন্ট্রি ফি বাড়ার কথাটাও পাঠককে জানিয়ে দিয়েছিল, আজকের কাগজে সে রিপোর্ট বেরিয়েও গেছে। অনুষ্ঠানের শেষে সমু অন্যান্য সাংবাদিকদের সঙ্গে পারিখকে বাইট দেবার জন্য চেপে ধরেছিল। পারিখ হাসি হাসি মুখ করে যা বলেছিল তার মোদ্দা কথাটা হল, পার্কে কয়েকদিনের মধ্যেই আরও কয়েকটা বাঘ এসে যাবে। তারা বাচ্চাদের সঙ্গে হাত মেলাবে, চকলেট দেবে। টকিং টাইগাররা ওদের সঙ্গে কথা বলবে। সমু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘টকিং টাইগাররা কি একেবারে হালুম করবে?’ পারিখ বলল,-- ‘না না একেবারে সিম্পল অ্যামিউজমেন্ট। কম্পুটারে ডাটা ফিট করা থাকবে, বাচ্চারা বাঘের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেই সেই সেগুলো শুনতে পারবে। ইচ্ছে করলে বড়রাও হাত মেলাতে পারেন, যাতে বাচ্চারা ভয় না পায়।’ তারপর একটু চোখ টিপে বলেছিলেন, ‘দেখুন না আরও কত অ্যামিউজমেন্টের ব্যবস্থা করি। আমাদের কোম্পানির এই টাইগার প্রোজেক্ট একটা দারুণ ব্যাপার। দেখে চমকে যাবেন, অনেক সারপ্রাইজ আছে। আপনারা লিখে নিতে পারেন, টেন টু ফিফটিন ক্রোরস্ আমাদের কোম্পানি এই প্রোজেক্টে খরচ করছে। যা রিটার্ন আসবে সেখান থেকে সেন্ট্রাল গভমেন্ট আর ওয়ার্ল্ড টাইগার প্রোজেক্টে একটা ফান্ডিং করা হবে। টাইগার বাঁচানোর জন্য রেনুজি ফিলিম স্টারদের, ক্রিকেটারদের চিটঠি লিখে লিখে টাকা আনছেন আর অ্যাডপ্ট করাচ্ছেন বটে – কিন্তু সেটা আর কতদিন চলবে। একটা অল্টারনেটিভ তো ভাবতে হবে – কমন পিপুলকেও ইনভলভ্ করাতে হবে।’ সমু দেখল দুটো বাঘের শরীরেই পারিখের কোম্পানির লোগো লাগানো আছে। যে ফাস্টফুড কর্নার লাগানো হয়েছে সেখানে চকলেট থেকে কাটলেট – সবেতেই কোম্পানির গন্ধ ম ম করছে। প্রথম দিন ওপেনিং বলে ফ্রি। সুবেশী তরুণীর হাত ঘুরে দুটো চকলেট সমুর পকেটেও জমা পড়েছিল। তারই একটা চিবোতে চিবোতে আবার ধোনিকে দেখতে পেল সমু – একটা ল্যাম্প পোস্টে ঝুলছেন। আচ্ছা ওর পাশে যে বাঘটার ছবি দেওয়া আছে তা কি ওর পোষ্যপুত্র অগস্ত্যর? ধোনি কি কোনও দিন তার এই পশুপুত্রকে দেখতে যাবার সুযোগ পেয়েছে? অবশ্য পুত্র হলেও ছুঁয়ে ছেনে দেখার ব্যাপারটা এই দত্তক নেবার ব্যবস্থায় নেই। কর্ত্তৃপক্ষ শুধু পশুপালনের থোক টাকাটা পেলেই খুশি। এ যেন বাপ থেকেও নেই। বনের রাজার কী দুর্দশা! – এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে নিজের সঙ্গে কথা বলে চলে সমু। হঠাৎ খেয়াল হল, বাসটা নড়ছে না বেশ কিছুক্ষণ। গণেশগুড়ি বাজারের এ-দিকটা এমনিতেই কনজেসটেড। প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তা বেশ সরু। এরমধ্যেই গাড়ির তিন-চারটা লাইন হয়ে গেছে। এছাড়া স্কুটার-বাইক তো আছেই। উল্টোদিক থেকে অবশ্য ট্রাফিক চলছে, তবে ধীর গতিতে। দু-তিন মিনিট পর সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। একটা বিচ্ছিরি অবস্থা। আবার কোথাও গোলমাল বাঁধল না তো! চট করে ঘড়ি দেখে নিল সমু – বারোটা দশ। এমনিতেই অফিসের দেরি হয়ে গেছে। এই জ্যামে ফেঁসে গেলে চাকরি নট হয়ে যাবে। সম্পাদকটি একেবারে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার । এর থাবা থেকে বাঁচতে হলে এই অস্বাভাবিক জ্যামের একটা রিপোর্টিং করে নেওয়া যায়। তাহলে নেমে দেখতে হয় এই জ্যামের কারণটা কী – তেমন কিছু পাওয়া গেলে পথচলতি দু-চারজনের বাইট নিলেও ভাল খাবে মালটা। বাসের পা-দানিতে দাঁড়াতেই একটা হৈ হৈ আওয়াজ শোনা গেল। সমু মুখ বাড়িয়ে দেখল, একদল জনতা দৌড়ে এদিকেই আসছে – তাদের পেছনে সম্ভবত পুলিশের ডান্ডা পড়েছে। সে দ্রুত নেমে গিয়ে ওই জনতার ভিড়ে মিশে গেল। দুই এই শহরে রতনদের দিন যেভাবে শুরু হয় সেভাবেই আজও শুরু হয়েছিল। বড় বড় ড্রামগুলোকে সাইকেলের পেছনে দুপাশের ক্যারিয়ারে বেঁধে ঠেলে ঠেলে নিচে নামিয়ে আনা। খাটাল থেকে দুধ ড্রামগুলোতে ভরে কলোনির দিকে রওয়ানা। এক ড্রাম মিষ্টির দোকানে আর অন্য ড্রামটি মাসকাবারি গাহেকদের বিলিয়ে এগারোটা নাগাদ বাজার থেকে সবজি কিনে আবার সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে পাহাড়ে ওঠা। রতনের ঘর একটা অদ্ভুত ভৌগোলিক প্যাটার্নে দাঁড়িয়ে। ওপরে তার বুড়ো মা-বাবা আর এক ভাই তার বউকে নিয়ে থাকে আর নীচে তার নিজের সংসার। সোজা অনেকটা ওঠার পর সরু পাহাড়ি রাস্তাটা বাঁদিকে ঘুরলেই একটা পাথরের আড়ালে রতনের একটুকরো পরিচ্ছন্ন উঠোন। একেবারে পাহাড়ের গায়ে তার দু-কামরার একচালা ঘর, দরমার বেড়া – ওপরে টিন। ঘরের পাশে একটা মোটা নল ঝোলানো আছে। ওটা দিয়েই ঝরনার জল ওপর থেকে নীচের চৌবাচ্চায় ঢালা হয়। ঝরনাটা আছে পাহাড়ের অন্য ঢালে। তার পাশেই রতনদের ওপরের ঘর। ওঘরে যেতে হলে রতনের উঠোন পেরিয়ে আর এক বাঁক ঘুরে ওপরে উঠতে হয়। সেখানেও দুটো ঘর। তবে জায়গা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় ছাগল রাখবার চালাটাও ওপরেই করেছে রতন। সেটাও দরমার বেড়া দিয়েই ঘেরা। ঝরনাটা ওই ঘরের পাশে। শীতকাল বলে খুব একটা জল আসে না। সারাদিনই টিপটিপ করে পড়ে। রতন ছাগলের ঘরের পাশে পাহাড়ের গায়ে একটা ছোট জায়গা টিনের টুকরো দিয়ে ঘিরে দিয়েছিল। ওটাই এ-বাড়ির মেয়েদের স্নানঘর। সাধারণত ভোরের দিকে মেয়েরা কেউ স্নান করে না। বেলা গড়ালে রান্না-বান্না সেরে তবে স্নান। আজ রতনের বউ লছমি যাবে বাপের বাড়ি। ভোর ভোর রতনের সঙ্গেই বেরোবে বলে স্নানে গেছে। স্নানঘরে ঝোলানো চটের পর্দা সরিয়েই চিৎকার। এক দৌড়ে শ্বাশুড়ির বিছানায় উঠে ‘দরজা বন্ধ গরনুস, দরজা বন্ধ গরনুস’ বলে চেঁচাতে শুরু করেছে। রতন সবে সাইকেলে দুধের ড্রাম দুটো বাঁধছিল। চিৎকার শুনে সাইকেল ফেলেই উঠে এসেছে – ‘কে ভয়ো, কে ভয়ো লছমি?’ লছমি শ্বাশুড়ির বুকে মাথা রেখে কোনও মতে স্নানঘরের দিকে হাত তুলে বলল, ‘মানছি ছ’। ‘মানছি!’ মানুষ এখানে কোথা থেকে আসবে! দু-ঘর আছে অনেক ওপরে। ওদের কেউ এখানে স্নান করতে আসার কথা নয়। নীচের বাঁকটায় যারা থাকে তারাও সাতসকালে স্নান করার জন্য ওপরে উঠে আসবে না। তাহলে কোন মানছি এল? রতনের ভাই সুরজও মুখে ব্রাস নিয়ে উঠে এসেছে। চারদিকে আলো থাকলেও কুয়াসার জন্য স্নানঘরের কোণটা একটু অন্ধকারই। সে একটা লাঠি নিয়ে এগিয়ে গেল। স্নানঘরের পর্দা সরিয়ে যা দেখল তাতে অন্য কেউ হলে ভিরমি খেত। সুরজ সন্তর্পণে পিছিয়ে এল। তার চোখে মুখে একটা আতঙ্কের ছাপ। দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে একটা কথাই বলতে পারল,‘বাঘ হুনছ’। কথাটা বলেই সুরজ নিচে দৌড় লাগালো। কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব দাঁড়িয়ে থেকে রতন দৌড়ে উঠল মায়ের ঘরে। ভেতর থেকে কুকরিটা নিয়ে একলাফে বাইরে। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিতে বলল। বাবাকেও ঘরের বাইরে আসতে বারণ করল। ওদিকে ছাগলগুলো ম্যাঁ ম্যাঁ করে চিৎকার করছে। এমনিতে সুরজের সঙ্গে এটাই ওদের বেরোবার সময়। কিন্তু এ হৈ-চৈ বাইরে বেরোবার আনন্দে নয় – একটা অস্বস্তি বা অজানা ভয়ের। ইতিমধ্যে সুরজের সঙ্গে টাঙ্গি, ছোট বল্লম, হাত-দা, ভোজালি ইত্যাদি অস্ত্র সম্ভার নিয়ে অনেকেই পৌঁছে গেছে অকুস্থলে। কেউ একজন জোরে জোরে ক্যানেস্তারা বাজাচ্ছে। সবারই চোখ স্নানঘরের দিকে। দেখতে দেখতে লোক জমায়েত হয়ে গেল। কিন্তু বাঘের সাড়াশব্দ নেই। কেউ এগোতেও সাহস করছে না। এর মধ্যে একজন একবাক্স চকলেট বোম নিয়ে এসেছে। দুটো ফাটানো হল। এবার বাঘ বাছাধনের বেরিয়ে আসার কথা। কিন্তু কোথায় কি! ছাগলগুলো বোমের আওয়াজে ভয় পেয়ে চুপ। এবার স্নানঘর লক্ষ্য করে আধলা ইঁট ছোঁড়া শুরু হল। তাতেও কোনও আওয়াজ নেই। কেউ কেউ বলতে শুরু করল, আদতে বাঘ ছিল তো ওটা – না কি অন্যকিছু? কিন্তু দু-দুটো লোক তো আর মিথ্যে বলবে না। তাহলে বাঘের হলটা কী? এবার দু-একজন সাহসী ছেলে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল লম্বা বাঁশ নিয়ে। চটের পর্দাটা খোঁচা দিয়ে ওঠাল। ও মা, বাঘ কোথায়?! স্নানঘর তো খালি। সবাই মিলে এবার এগিয়ে গেল। ঠিকই তো! বাঘ কোথায়? কথা শুনে লছমিরাও বেরিয়ে এল। কোথাও বাঘের দেখা নেই। ছেলের দল হৈ হৈ করে বাঁক ঘুরে রতনের উঠোনে নামতে যাবে – ঠিক এমনি সময় নীচ থেকে কেউ চেঁচিয়ে উঠল ‘বাঘ, বাঘ’। প্রায় পাঁচ হাত লম্বা প্রাণীটিকে তখ্খুনি দেখা গেল এক লাফে রতনের ঘরে ঢুকে যেতে। পূর্ণ বয়স্ক নয় বোধহয়। কিন্তু বাঘ তো। কেউ চট করে এগোল না। কেউ খোলা দরজা দিয়ে পর পর কয়েকটা বোম ছুঁড়ে দিল। সঙ্গে পাথরও ছুঁড়ল কেউ কেউ। বোমের শব্দেই বোধহয় বাঘটা বেরিয়ে এল। কিন্তু কোথায় যাবে, চারদিকে লোক। চৌবাচ্চাটার পেছনে গিয়ে লুকোল। এবার পাথর, বল্লম, হাত দা ইত্যাদি ছোঁড়া শুরু হল বাঘটাকে লক্ষ্য করে। হঠাৎ বাঘটা দু-পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতেই একটা বল্লম গিয়ে বিঁধল গলার কাছটাতে। একটা লাফ দিয়ে বাঘটা এসে পড়ল চাতালের খোলা জায়গায়। শুরু হল বাঁশ, লাঠি , দা ইত্যাদি দিয়ে নির্মম প্রহার। প্রথমে একটু দূর থেকে, তারপর কাছ থেকে। এই ব্যাপার চলল যতক্ষণ না বাঘটা নিস্তেজ হয়ে গড়িয়ে পড়ল। এটা একটা বাচ্চাই। মরে যাবার পর এবার সবার খেয়াল হল যে ফরেস্ট অফিসারকে খবর দিতে হয়। কে যাবে অফিসে? ফোন নম্বর কেউ কি জানে? কীভাবে জানবে। পাহাড়ে বাঘ নামতে পারে ভেবে ফরেস্ট অফিস থেকে ফোন নম্বর দিয়ে গেছে নাকি? কেউ বলল ১০৮এ খবর দিতে। থানাতেও জানানো যায়, কিন্তু সবচেয়ে ভালো গাঁওবুড়ার কাছে যাওয়া। রতন সবাইকে বলে দিল, ‘খবরদার! বাঘের বাচ্চাটা যে ঘরে ঢুকেছিল সেটা যেন কেউ না বলে। বলতে হবে ছাগল খেয়ে পালাচ্ছিল।’ সুরজের এক বন্ধু বলল,‘বাঘটাকে কুয়োয় ফেলে দিলে কেমন হয়? বলব যে রাতে কীভাবে কুয়োতে পড়ে গেছে জানি না। বাঁচাতে গিয়ে আমরা বাঁশ নামিয়েছিলাম, তাতে খোঁচা খেয়েছে।’ একদল এতে সায় দিল। কিন্তু রতনের কথা হল, বল্লমের দাগটার কী হবে। ফরেস্টের বাবুরা তো বুঝে ফেলবে। শেষে ঠিক হল যে, বলতে হবে বাঘটা ছাগলগুলোকে খেতে এসেছিল। রতন আর সুরজ ছাগল বাঁচাতে গেলে বাঘটা তাদের ওপর হামলা করে। তখন এরা আত্মরক্ষার জন্য কুকরি মারে। তাদের চিৎকারে লোকজন জড়ো হয়ে যায় আর বাঘটাকে অনেক কসরত করে মেরে ফেলে। নাহলে সুরজ বা রতন কারও একজনের জান চলে যেত। খবর পাওয়ার প্রায় চারঘন্টা পর কাছের ফরেস্ট বিট অফিস থেকে চারজন ফরেস্ট গার্ড ওঠে পাহাড়ে। সব বয়ান লিখে নিয়ে মরা বাঘটাকে বাঁশে বেঁধে নিচে নেমে আসে। এখন প্রথামাফিক কাজগুলো সেরে তারপর তদন্ত শুরু হবে – কেন বাঘেরা লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। মানুষের হাতে বাঘের অহেতুক মৃত্যু এড়াতে হয়ত পাহাড়ে উচ্ছেদ অভিযানও শুরু করা হতে পারে। তবে এখন বাঘটাকে ঘিরে যেন একটা বিজয়োৎসব চলেছে। রতন, সুরজ তো আছেই – সঙ্গে ওই পাহাড় আর তার সমতলের লোকেরাও আছে। খবর পেয়ে কয়েকটা নিউজ চ্যানেলও চলে এসেছে – পাহাড়ে বাঘ হত্যা একটা বড় খবর। ধীরে ধীরে ভিড় বাড়ছে সমদলে। বড় রাস্তায় ভিড়টা নামতেই সব এলোমেলো হয়ে গেল। ভিড়ের জন্য গাড়ির যাওয়া আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। পুলিশ এই ভিড়কে সামলাতে লাঠি নিয়ে তাড়া করে যেতেই পরিস্থিতি আরও বেসামাল হয়ে গেল। লোকজন এদিক ওদিক ছুটতে আরম্ভ করল। পথচারি দু-একজন এদের জিজ্ঞেস করল, ‘কি হয়েছে?’ এরা সংক্ষেপে সারল,‘বাঘ, বাঘ’। আর যায় কোথায়, সবাই ছুটতে লাগল ‘বাঘ, বাঘ’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে। তিন দুপুর না গড়াতেই আজ রশ্মি প্রীতমকে নিয়ে পার্কে ঢুকেছে। ঘড়িতে তখন পৌনে বারোটা। শীতের রোদ এই সবুজে ঘেরা নিরালায় বেশ ভালোই লাগে। কলেজ পালিয়ে পার্কে আড্ডা দেওয়ার এটাই বেস্ট সময়। এখন কচিকাঁচাদের নিয়ে বুড়োরা আসে না। ওদের ভিড়টা হবার আগেই এরা এখান থেকে বেরিয়ে যাবে। সবুজ বুশের ঘেরাটোপে রশ্মি নীল ওড়না বিছিয়ে দেয়। প্রীতম পপকর্নের ঠোঙাটা এগিয়ে দেয় রশ্মির দিকে। দুজনে গল্প করতে শুরু করে – ক্লাসের, সিনেমার, মিউজিক অ্যালবামের আর গরম খবরের। প্রীতম বলে, ‘আজ টিকিট কুড়ি টাকা করে নিল। কেন জানিস?’ রশ্মি মুখ তোলে। প্রীতম বলে,‘আজ থেকে এখানে টাইগার পয়েন্ট হচ্ছে, বাচ্চাদের অ্যামিউজমেন্টের জন্য, আজকের কাগজে পড়িসনি?’ রশ্মি বলল,‘সেটাতো বাচ্চাদের জন্য, আমাদের জন্য তো নয়!’ প্রীতম খেপায়,‘তোর অ্যামিউজমেন্টের জন্য তো আমিই আছি। বাঘের মতো হালুম করে ঝাঁপিয়ে পড়ব ঘাড়ে।’ রশ্মি ভয় পাওয়ার ভান করে সরে যায়। বলে,‘যদি সত্যির বাঘ আসে না, তবে তোর ওই হালুম করা বেরিয়ে যাবে।’ প্রীতম চেঁচিয়ে ওঠে ‘বাঘ, বাঘ’। আর এক দৌড়ে ওখান থেকে ছুটে বেরোয়, রশ্মিকে ফেলে রেখেই। রশ্মি হেসে গড়িয়ে পড়ে প্রীতমের এই কান্ড দেখে। ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে বলতে থাকে ‘ভীতু, ভীতু কোথাকার।’ কিন্তু পুরোটা বলা তার হয়ে ওঠে না। হাসির দমকটা তার গলাতেই আটকে যায়। সে দেখে একটা বাঘ তার চার-হাত দূরে। বাঘটা তার দিকে তাকিয়েই মাটিতে লেজ আছড়াচ্ছে। একটা গোঁ গোঁ আওয়াজ করে রশ্মি ওখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পার্কে তখন খুব একটা লোক নেই। প্রীতমদের মতোই বেশিরভাগ। প্রীতমের চিৎকারে সবাই সজাগ হয়ে ওঠে। ঠিকই একটা বাঘ ধারের সবুজ ঝোপটার কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর লম্বা লেজটাকে মাটিতে আছড়াচ্ছে। এই বাঘটা যে আসল, পার্কের অন্য ধারে ফাস্টফুড কর্নারের পাশে দাঁড়ানো কোম্পানির ছাপ মারা বাঘগুলোর মতো যে মোটেও নয় – সেটা বুঝতে ওদের কারোরই বেশি সময় লাগল না। এরাও পড়ি-মরি করে এক দৌড়ে পার্কের বাইরে চলে গেল। মুহূর্তে মানুষ জমায়েত হয়ে গেল পার্কের বাইরে। কাউন্টারের লোকটি ভিড়ের প্রশ্নের জবাব দিতে না পেরে কাউন্টার বন্ধ করে দিল। কেউ সাহস করে ভেতরে যাচ্ছে না। এর মধ্যে প্রীতমের বন্ধুরা কলেজ থেকে দল বেঁধে চলে এসেছে। ওরা এসেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল। একজন গেটের ওপর চড়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করল,-- ‘ওই তো বাঘটা, এখন এদিকে আসছে।... না রশ্মিকে দেখা যাচ্ছে না। খেয়ে ফেলেছে বোধহয় রে....।’ আর একজন গেটের ওপর চড়ে বসল। তার মনে হল বাঘের মুখটা রক্তের মতো লাল, নিশ্চয়ই রশ্মিকে খাওয়ার চিহ্ন। চেঁচিয়ে সেটা সবাইকে জানাল। প্রীতমের এখন একটা বিধ্বস্ত অবস্থা। সে পার্কের গেটের সামনে বসে পড়ে কাঁদতে লাগল। চার সমু বাস থেকে নেমে স্বচক্ষেই দেখল সবকিছু। বনকর্মীদের কাঁধে বাঘের শেষযাত্রার কয়েকটা ছবিও তুলে নিল। সে যখন ছবি তুলছে তখন পাশ থেকে এক বুড়ো ভদ্রলোক আলগোছে একটা মন্তব্য ছুঁড়ে দিলেন,‘বাঘেরা বনে সুন্দর, খাদক শহরে....।’ সমু ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে হাসল, বলল – ‘ঠিকই বলেছেন।’ মনে মনে ভাবল এটাই তার নিউজের একটা ভালো ক্যাপশন হয়ে যাবে – ভালো খাবে পাব্লিক। এ-সময়েই তার পকেটে মোবাইল বেজে উঠল। সর্বনাশ, নির্ঘাত সম্পাদক বুড়ো। মোবাইল খুলে দেখল তারই এক সাংবাদিক বন্ধু। যাক বাবা, বাঁচা গেল। ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে উত্তেজিত গলা – ‘কোথায় আছিস, শিগগির নেহেরু পার্কের সামনে চলে আয়। পার্কে বাঘ। একটা মেয়েকে খেয়ে ফেলেছে বোধহয়।’ সমুর কথাটা বিশ্বাস হল না। বন্ধুটি মাঝে মাঝে এমন ইয়ার্কি করে থাকে, তিন তিনবার বললেও ধন্দ কাটে না-- ব্যাপারটা সিরিয়াস না পলকা। তাই সে বলল,‘ইয়ার্কি মারিস না। ওটা পারিখের বাঘ। কাল রিপোর্ট করে দিয়েছি, আজ নিউজ বেরিয়েও গেছে। পেপার খুলে দেখ, থার্ড পেজে তোর পার্কের বাঘটা আছে।’ ‘নারে। ইয়ার্কি করছি না। একদম সিরিয়াস। এই যে শোন, যে ছেলেটা ওর বান্ধবীকে নিয়ে পার্কে গিয়েছিল তার ভয়েস।’ সমু শুনল, সত্যিই খুব চেঁচামেচি হচ্ছে। আর একটা ছেলে কেঁদে কেঁদে বলছে, ‘বাঘটা আমার রশ্মিকে খেয়ে ফেলল রে, ওরে তোরা কেউ বাঁচা ওকে।’ বন্ধুটি আরও বলল যে বাঘটাকে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে। ফোন বন্ধ করে সমু ভাবল, কী গেরো রে বাবা! একই দিনে শহরের দু-প্রান্তে বাঘ নামল! বন্ধুর দুই আর ফোনে শোনা ছেলেটির চেঁচানো মিলিয়ে তিনবার বাঘ থাকার কথা তো জানাই গেল। ব্যাপারটা তাহলে সত্যি। সে খুঁজতে লাগল কীভাবে তাড়াতাড়ি নেহেরু পার্কে পৌঁছনো যায়। উল্টোদিকে একটু হেঁটে গিয়ে এক বাইকওয়ালাকে পাওয়া গেল। তাকে বাঘের তান্ডবের কথা বলতেই সে নিয়ে যেতে রাজি হল। বাইক ছুটল জু-রোড ধরে। অনেকটা ঘুরে পৌঁছনো গেল নেহেরু পার্কে। ওখানে তখন সাংবাদিক সহ অনেক মানুষের জটলা, চার-পাঁচটা টি.ভি চ্যানেলের লোকেরা তো আছেই। সমু বন্ধুকে খুঁজে নিয়ে ওই জটলায় ঢুকে গেল। তাকে বলল,-- ‘আজ একটা জব্বর রিপোর্টিং হবে। সম্পাদক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করার সপক্ষে একটা জোরালো সম্পাদকীয় লেখার সুযোগ পেয়ে যাবে। এদিকে বাঘের ঘায়ে মানুষ ঘায়েল, ওদিকে মানুষের ঘায়ে বাঘ। মাঝখানে পারিখ। ভালোই জমেছে।’ প্রীতমের পেছন পেছন পার্কের ভেতর থেকে যারা বেরিয়ে এসেছে, কয়েকজন তাদের জিজ্ঞেস করছে,‘কি হয়েছে ঠিক করে বলো। মেয়েটাকে কি বাঘে খেয়েছে?’ এরা এতটাই নার্ভাস যে ঠিক ভাবে কথাই বলতে পারছে না। সমু চেষ্টা করল সেখান থেকে কিছু খবর বার করার। আতঙ্ক ছাড়া স্পষ্ট কিছুই পাওয়া গেল না। শীতের সময়। শহরের চারদিক ঘেরা পাহাড়গুলো থেকে প্রায়ই বাঘ নেমে আসে লোকালয়ে। কারও বাড়ির ছাগল বা মুরগি ধরে খাবার কথাও শোনা যায়। কিন্তু এই নেহেরু পার্কে কোনওদিন বাঘ ঢুকতে পারে তা কল্পনারও বাইরে। কিন্তু সেই বাঘ ঢুকেছে এবং মানুষও খেয়েছে – সেটা সত্যি। কেন কদিন আগেই তো চিড়িয়াখানায় ছবি তুলতে গিয়ে একটা লোক বাঘের খাঁচায় হাত বাড়িয়ে প্রাণটা খোয়ালো না! সেটা তো খাঁচার বাঘ। আর এটা ছাড়া পাওয়া – একেবারে জঙ্গলের আসল জিনিস। ও মানুষ পেলে খাবে না এমন কোনও গ্যারান্টি তো নেই। চারপাশে জমে যাওয়া ভিড়ের এইসব টীকা-টিপ্পনির মাঝেই পুলিশ এসে গেল। তার আগে কলেজ থেকে কয়েকজন টিচারও ঘটনাস্থলে এসে গেছেন। তাঁদেরই কেউ সম্ভবত থানায় খবর দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ এখানে করবে কী? তারাও ভেতরে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না। এটা একমাত্র ফরেস্ট গার্ডরাই পারে। ওদের সঙ্গে ঘুম পাড়ানো বুলেট চালানোর জন্য ভেটেরিনারির ডাক্তার থাকে। তাকে দিয়ে বাঘ ঘায়েল করা সম্ভব। আর পুলিশ এমনি গুলি চালালে বিপদ। বাঘ মারার দায়ে জেল হয়ে যেতে পারে। তাই কোনও পুলিশই এগোচ্ছে না। তারা ভিড়টাকে সামলাবার চেষ্টা করল। ছাত্রদের সঙ্গে কয়েকবার কথা কাটাকাটিও হয়ে গেল তাদের। ছাত্ররা খেপে গিয়ে রাস্তায় বসে পড়ল। তাদের দাবি, রশ্মিকে উদ্ধার করতে হবে। পুলিশ প্রশাসন কাজে অবহেলা করছে। ট্রাফিক যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেল নিমেষেই। খবর গেল চিড়িয়াখানায়, ফরেস্ট অফিসে। এরা লোক পাঠাচ্ছি বললেও ঘন্টাখানেক। কারণ শহরের জানজট ঠেলে অতদূর আসাটাও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এদিকে যত সময় যাচ্ছে জনতা তত অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। থানা থেকে বিশাল পুলিশ বাহিনি চলে এল এদের সামলাতে। চারদিক থেকে নানাভাবে লোকে দেখতে চেষ্টা করছে মানুষখেকো বাঘটাকে। পুরো চত্বরটাকে পুলিশ ঘিরে ফেলল। পাশের পাঁচতলা বিল্ডিংয়ে উঠে গিয়ে কেউ কেউ দেখল, সত্যি বাঘটা পার্কে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কখনও বসছে। আবার উঠে চক্কর মারছে সারা পার্ক জুড়ে। কারও কারও মনে হল ঝোপের মধ্যে একটা মেয়ের আধখাওয়া শরীর পড়ে আছে। ঝোপের ফাঁকে রশ্মির নীল ওড়নাটা মাটিতে লুটোতে দেখা যাচ্ছে। সব খবরগুলো নানা দিক থেকে মোবাইলে গেটের বাইরের জমায়েতের কাছে চলে আসছিল আর উত্তেজনার পারদ চড়ছিল। শেষ পর্যন্ত আধা সামরিক বাহিনির লোকেরা এসে ভিড়কে ঠেলে সরিয়ে জায়গাটা খালি করে ফেলল। বারে বারে মাইকে ঘোষণা করা হল সবাইকে সরে যেতে। বড় বড় নো পার্কিং বোর্ড দিয়ে চারদিকে সাধারণ মানুষের যাওয়া আসা বন্ধ করে দেওয়া হল। ফায়ার ব্রিগেডও হাজির। খবর পাওয়া গেল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে নাকি লোক এসে গেছে। বাঘটাকে বোধহয় মেরেই ফেলতে হবে। বেকায়দায় পড়লে আর কি করা যাবে। তবে ঘুম পাড়ানো গুলি দিয়ে শোয়ানোর চেষ্টাই আগে করা হবে। একটা বড় খাঁচাসহ গাড়ি গিয়ে দাঁড়ালো পার্কের গেটে। সমস্তটা প্ল্যান করে নিতে আরও পনেরো মিনিট। এরপর সাবধানে গেট খুলে পাঁচ জন পাঁচ জন করে চারটে ফরেস্ট গার্ডের দল ঢুকে গেল পার্কে। পোজিশন নিল। বাঘটাকে দেখতে পাওয়া গেল ঝোপের ওধারেই গোল হয়ে ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতেই মাঝে মাঝে বসছে, লেজ আছড়াচ্ছে। পার্কে বন্দুক হাতে লোক দেখে বোধহয় একবার তাকালো। অমনি গার্ডরা মাথা নিচু করে বসে পড়ল। বাঘ যদি মানুষের গায়ের গন্ধ পেয়ে যায় বা দেখে ফেলে তবে বিপদ। বাঘটা এবার পার্কের সামনের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তবে একটু এসেই আবার পুরনো জায়গায় চলে গিয়ে আগের মতোই চক্কর কাটতে শুরু করল। এবার রাইফেলধারী ডাক্তার ও গার্ডরা আরও একটু এগিয়ে গেল। উদ্দেশ্য কাছ থেকে ঘুম পাড়ানি বুলেট চালানো। মওকা পেয়ে ডাক্তার ঠিক দু-চোখের মাঝখানটা তাক করে গুলি ছুঁড়ল। লাগল। কিন্তু বাঘটা তো দাঁড়ালো না! আঘাত পেয়ে চিৎকার বা লাফ কোনওটাই দিল না। তবে কি ওটা লাগেনি! লক্ষ্য ভুল হবার তো কথা নয়। ওরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকালো। ওষুধ-গুলিটা লাগলো না বোধহয়। ওদিকে বাঘটা ঘুরতে ঘুরতেই এবার দিল ছোট্ট একটা লাফ । তারপর দু-পায়ে ভর দিয়ে একবার দাঁড়ালো। অফিসার নির্দেশ দিলেন ‘ফায়ার’। এবার ডাক্তার নতুন একটা ভায়েল চালালো। বাঘটা পড়ে গেল মাটিতে। আর উঠল না। অফিসার সহ গার্ডরা দৌড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল ওরা বাইরে বেরিয়ে আসছেন হাসতে হাসতে। কিছুক্ষণ আগের টানটান উত্তেজনার ভাবটা আর নেই। সমুরা গেটের বাইরে অপেক্ষাই করছিল এদের জন্য। অফিসারটি ওদের দেখে এগিয়ে আসতেই এক ঝাঁক প্রশ্ন উড়ে এল,-- ‘বাঘটাকে কি মেরে ফেললেন না ঘুম পাড়ালেন? বাঘটা কোথায়? মেয়েটা কোথায়? মেয়েটার কী অবস্থা? মেয়েটা কী মরে গেছে? বাঘ ওর কতটা খেয়েছে?’ অফিসার হাত তুলে সবাইকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন,‘বাঘটা পারিখ অ্যান্ড পারিখ কোম্পানির একটা সারপ্রাইজ। উন্নতমানের কম্পুটারাইজড্ পুতুল।’ -------------------

Saturday 21 May 2011

উনিশের ভাবনা

উনিশের গণ্ডি -- উনিশের মুক্তি
          কতবার বর্তমান হয়ে গেছে ব্যথিত অতীত -- জীবনানন্দের এই উক্তিকে উনিশে মে সম্পর্কে আজ বড়ই প্রাসঙ্গিক মনে হয়। সত্যিই তো, পায়ে পায়ে পঞ্চাশটা বছর পেরিয়ে এলাম। কত স্মৃতি, কত কথা, কত গান, কত কবিতা, কত গল্প। উনিশকে নিয়ে বইও লেখা হয়ে গেছে বেশ কিছু। তবু ব্যথিত অতীত বারেবারেই ছবির মতন ফুটে ওঠে। একদিকে যেমন জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে বারবার আন্দোলিত হয়েছে ভুবনায়িত জীবন, অন্যদিকে তেমনি একরাশ হতাশা। একদিকে তার প্রাপ্তি অন্যদিকে তার পরিসরহীনতা। এই দ্বান্দ্বিকতা নিয়েই আজকের উনিশ। 
            সময়ের প্রবাহে পঞ্চাশটা বছর কম নয়। বাংলাদেশের ভাষা-সংগ্রাম আটচল্লিশ বছরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই হিসাবে উনিশের বলিদান বিশেষ কিছুই লাভ করেনি। শুধু উনিশ কেন, পরবর্তীতেও বরাক উপত্যকায় ভাষা-মায়ের পায়ে যে সমস্ত প্রাণ নিবেদিত হয়েছে, জনমানসে তার স্বীকৃতির পরিসর সীমিত। অবশ্য কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপত্যকার সরকারি ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে প্রাপ্তি বলেই স্বীকার করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, উপত্যকাভিত্তিক ভাষা ব্যবহারের এই সরকারি নীতি শেষ পর্যন্ত সেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। একটি স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছিল এভাবেই। তবে এই সাফল্য এবং হাল আমলে দিল্লী, কলকাতা বা অন্যত্র কয়েকটি স্মৃতিচারণমূলক সভাকে যদি উনিশের স্বীকৃতিমূলক বিস্তার বলে ধরে নেওয়া হয় তবে তা হবে একটি ফ্রেমে বাঁধানো ছবির গ্রন্থনা। বছরের পর বছর সেই অ্যালবামে ছবি জমা হচ্ছে। গুণীজনেরা বলেন, প্রবলভাবে যা বর্তমান ছিল কখনও তা যখন স্মৃতির গ্রন্থনা মাত্র হয়ে দাঁড়ায়, ধাবমান সময়প্রবাহের পক্ষে সমস্তটা হয়ে পড়ে অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক। এটাই কি তাহলে উনিশের ভবিতব্য? অর্ধ শতক পেরিয়ে যাবার পর আজ কি সে শুধু অমলিন গৌরবময় 'পটে লিখা' ছবি? 
          কিছুদিন আগে এই অভাজন একটি লেখায় বলেছিলেন, উনিশে মে-র ঘটনা বর্তমান প্রজন্মের কাছে 'দূরতর ইতিহাস'। পরবর্তী পাঠক প্রতিক্রিয়ায় এই বক্তব্যকে অস্বীকারও করা হয়নি। তবু আজ যদি কোনও আগ্রহী পড়ুয়া উনিশের ভাবনাকে জানতে চান, তবে কি তাঁকে বরাকের ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন উত্তাপ আর পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বয়ান শুনেই তৃপ্ত থাকতে হবে? উনিশ যা দিয়েছে তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিস্তৃত সময়ের ইতিহাস। আজ তাকে জেনে নেওয়া শ্রমসাধ্য হলেও দুঃসাধ্য নয়। অতএব প্রত্যক্ষভাবে বরাকভূমি সংলগ্ন না হয়েও আজকের অনুসন্ধিত্সু সেই কালনির্দিষ্ট আবেগকে আত্মস্থ করে নিতে পারবেন। সময়ের দূরত্বের জন্য তাঁর সঙ্গে উনিশের নৈর্ব্যক্তিক যোগাযোগ গড়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক। তখন উনিশ-সংলগ্ন ইতিহাস তাঁর কাছে আর একমাত্রিকতায় ধরা দেবে না। কেউ যদি ১৯৬১র মে মাসের সেই দগ্ধ দুপুরে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে পুলিশি বর্বতার পূর্বাপর বৃত্তান্ত নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হন তবে ওই নতুন পড়ুয়ার নৈর্ব্যক্তিক মন আরও এক বৃত্তান্তকে খুঁজে নেবে -- বৈপরীত্যই যার প্রকৃতি। কেননা যে-কোনও পরিস্থিতিই ন্যূনতম দ্বিমাত্রিক। বর্তমানের সচেতন মনন সেই দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতিতে সত্য আবিষ্কারেই মন দেবেন। কোনও অন্ধগলির দিকে এগিয়ে যাওয়া তাঁর কাম্য হবে না। তখনই তিনি উনিশের ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। তখন তিনি জানতে চাইবেন উনিশের সম্ভাবনাকে -- উনিশ কী দিতে পারে , সেই অনুসন্ধানে তিনি ঋদ্ধ হতে পারেন। উল্টোদিকে, স্মৃতির গ্রন্থনা তাঁকে নিরুত্সাহিতই করবে। 
          উনিশের ভাবনা নির্মাণে আঞ্চলিকতার নির্মোক খসিয়ে ফেলার সাম্প্রতিক প্রয়াস আমাদের চোখে পড়েছে। বলা হচ্ছে, উনিশ মানে একটি সাংস্কৃতিক বহুত্বের মাঝে প্রত্যেকটি এককের ফুটে ওঠার অধিকার। প্রত্যেকটি একক যখন একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে, প্রত্যেকটি একক যখন একে অপরের প্রেরণা হয়ে ওঠে, তখনই মূর্ত হয় উনিশের চেতনা। বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক প্রতীক নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের আবহমান সংস্কৃতিধারার বর্ণালীর প্রতিনিধি হিসাবে উনিশকে দেখা হচ্ছে। এই উপলব্ধির সম্প্রসারণ ভাবীকালকে অনেকগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
           উত্তর-পূর্বের বহুমাত্রিক ও জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক-ভাষিক সংস্থান বা বিন্যাস কোনও একক সংস্কৃতি নির্মাণে সক্ষম হয়নি। বরং সংস্কৃতির বৈচিত্র্যই এখানকার বিশিষ্টতা। সেখানে একটি মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিশেষ আবেগ জনমনে তৈরি হয়েছে তা কতটা ওই বৈচিত্র্যের কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারে? তার আভ্যন্তরীণ শক্তি কতটা যা সমস্ত বিচ্ছিন্নতাকে দূরে সরিয়ে পারস্পরিক বন্ধনকে নিবিড় করতে পারে? বৈচিত্র্যকে, যে-কোনও ভাবেই হোক, যদি অস্বীকার করি তাহলে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হয়। তবে সহাবস্থান অবশ্যই অগ্রাধিকার পেতে পারে। এবং সেই পরিস্থিতি যে একান্ত অসম্ভব, তা আশা করি কেউ বলবেন না। প্রত্যেক মানুষই শান্তি চান, সুস্থিতি চান। আর এই চাহিদাকে মেটাতে গিয়ে একে অপরের পরিপূরক বা প্রেরণা হয়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক। 
            কিন্তু আধুনিক বিশ্বে যখন আমরা প্রগতির কথা ভাবি তখন এই 'অপর'এর অস্তিত্বটা আর নেহাত পরিপূরক বা প্রেরণাদাতার সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে না। অন্তত আমরা যতদিন না আধিপত্যহীন সমাজব্যবস্থার জন্ম দিতে পারছি ততদিন এই 'অপর' থাকবে এবং তাকে নানাভাবে গ্রাস করবার চেষ্টাও থাকবে অব্যাহত। সুতরাং যখনই 'উনিশ' সাংস্কৃতিক বহুত্বের মাঝে সমন্বয়ের একক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইবে তখনই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। কারণ 'উনিশ' ভাষা আন্দোলন-মুদ্রার একটি পিঠ। সেই পিঠে যেমন বরাকপারের এগারো শহিদের ছাপ রয়েছে, তেমনই মুদ্রার অন্য পিঠে আছে ব্রহ্মপুত্রতীরের র়ঞ্জিত বরপূজারি সহ বহু ভাষাপ্রেমিক ও অস্তিত্ব সচেতন যুবকের রক্তচিহ্ন। কোনও কোনও ভাষাপ্রেমীর চিন্তায় তাই বরাকপারের মানুষ তাঁদের ভৌগোলিক পরিসর সহ ভাষিক পরিচয়ে কখনও কখনও অসমেরই আপনজন হয়ে ওঠেন। অথচ বরাকপারের মানুষ বা বাংলা ভাষার ইতিহাস যে একথা মেনে নিতে পারে, তেমন কোনও সম্ভাবনা এখনও তৈরি হয়নি। এই চরম দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতিতে আঞ্চলিকতার বোধকে দূরে সরিয়ে রাখার কথাটা যত উন্নত চিন্তাঋদ্ধ হোক, আসলে বাস্তবতার সম্পর্কহীন এক প্রকল্প মাত্র।
           একথা অস্বীকার করে লাভ নেই যে, উনিশ যা দিতে পারে তা ভাষাকে কেন্দ্র করেই ব্যাপ্তি পেতে সক্ষম। সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মতো ভাষা-বৈচিত্র্য যখন অসম তথা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তখন এই বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে নিয়ে এতদঞ্চলের প্রত্যেকটি ভাষার শ্রীবৃদ্ধি ঘটানোই আজকের লক্ষ্য হওয়া উচিত। পৃথিবীর উন্নত দেশ বলে পরিচিত হোক বা তাকে আধুনিক বিশ্বই বলি, -- সবারই প্রগতির অবলম্বন মাতৃভাষা। ঔপনিবেশিকতাকে আঁকড়ে ধরেছি বলেই আমরা মাতৃভাষাকে অবহেলা করি। আর বোধহয় সেজন্যই প্রতিবেশীর ভাষাকেও যোগ্য সম্মান দিতে কুণ্ঠিত হই। ভাষার অবমাননা আজ দিকে দিকে, নানা রূপে। কিন্তু বরাকের ইতিহাসে 'উনিশ' এসেছিল ভাষাকে অবলম্বন করেই। অতএব ভাষাকে যথাযোগ্য সম্মান জানিয়েই এই দিনটি তার প্রাপ্য মর্যাদা পেতে পারে।
              কোনও ভাষাই অবগাহনে বাধা দেয় না। ভিন্ন ভাষাশিক্ষার প্রতি আমাদের যে অনীহা আছে সেটাও নয়। অতএব উনিশ যদি সমস্ত অসূয়াকে দূর করে আজকের (উনিশে মে) দিনটি অন্য ভাষা জানবার দিন হিসাবে উত্সর্গ করে, তাহলে খুব একটা ক্ষতি হবে কি? অন্যকে জানা মানেই তো নিজেকে জানা, নিজের জ্ঞানরাজ্যকে বিকশিত করে তোলার চেষ্টা করা। এটা যদি হয়, তবে 'উনিশ' তার নিজস্ব গণ্ডির বাইরে গিয়ে একটা উত্কর্ষ পায়। এমনকী বহির্বিশ্বের কাছেও উনিশের ভাবনা তাহলে একটা তাত্পর্য লাভ করে। তখন আর মনে হবে না যে, আরেকটি উনিশে মে আরেকটি অতীত স্মৃতির গ্রন্থনা। তখন তা হয়ে উঠবে শাশ্বত, চিরন্তন। তবু একটি কঠিন জিজ্ঞাসা দিয়েই শেষ করব, -- আমরা কী আমাদের সমস্ত দ্বান্দ্বিকতার উপরে উঠতে পারব? পারলে কবে, কোন উনিশে মে-তে? 
--------------

Wednesday 11 May 2011

আমাদের সমস্ত অন্ধকার 
হা-নিশীথে মেলায় বারবার। 
টুপ করে ঝরে পড়ে -- আবার ঘুমোয়, জাগে 
তার সাথে অবিরল কথা -- চেনা ক্ষতে, পোড়া দাগে। 
কতটা আঘাত পেলে তা দুঃখে বদলে যায় 
সেটা সে-ই জানে।
পোড়া কপাল! 
বাতাসের হাসিতে উছলে ওঠে পোড়া গাছের ডাল।







Thursday 28 April 2011

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষার ভবিষ্যত্

         একটা পরিস্থিতির কথা ভাবা যাক। ধরা যাক, দু-হাজার কুড়ি সাল নাগাদ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে বাংলা ভাষা চিরতরে হারিয়ে গেল। অর্থাত্ এই ভূখণ্ডে একজন বাঙালিও আর রইলেন না। তখন কী হবে ? উদাসীন বলবেন, যা হবার তা হবে। অন্তত 'গেল' 'গেল' এই রবটা আর থাকবে না। যা যাবেই তা কি ধরে রাখবার জিনিস ? অন্যদল বলবেন, এমনটা যে হবে তা অনেকদিন আগেই জানতাম -- ভবিষ্যদ্বাণী তো করেই রেখেছিলাম। তিন নম্বর সম্ভাবনা হল, বরাক বা পশ্চিমবঙ্গের গবেষককুল আকূল হয়ে উঠবেন এর কারণ অনুসন্ধানী গবেষণাপত্র তৈরি করতে। জ্ঞানরাজ্যের ফলন বেশ ভালোই হবে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলো সরগরম হবে। যাঁরা এখনকার ভবিষ্যদ্বক্তা, তাঁদের চাহিদা তখন তুঙ্গে। কারণ তাঁরাই তো এমন একটা পরিস্থিতির প্রধান ব্যাখ্যাতা এবং উপাদান সংগ্রাহকের ভূমিকা গ্রহণ করবেন ! 
        পাঠক ভাবছেন হঠাত্ এমন একটা উদ্ভট প্রসঙ্গের অবতারণা কেন করলাম। করলাম এজন্য যে, বাংলা বিদ্যাচর্চার সঙ্গে জড়িত হবার পর আজ প্রায় কুড়ি বছর ধরে মাঝে-মাঝেই ভাঙা রেকর্ড বাজবার মতো প্রাজ্ঞজনদের মুখে এতদঞ্চলে বাংলা ভাষার স্থিতি সম্পর্কে সংশয়ী কথাবার্তা শুনে আসছি। দেখছি তাত্ক্ষণিক ভাবে ঘোলা জলে সাঁতার কেটে নিতেও কেউ কেউ বেশ উত্সাহী। চূড়ান্ত অজ্ঞতা সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে এতটাই নিঃসন্দেহ যে, অহেতুক দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করতে তাঁদের বাধে না। সুযোগসন্ধানীরা ইত্যবসরে বেনামিতে গায়ের ঝাল মিটিয়ে নেন। অন্তত আঞ্চলিক বাংলা সংবাদপত্রগুলোর চিঠপত্রের ঝাঁপি খুললেই তা বোঝা যায়। এতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষাচর্চার কী উন্নতি হচ্ছে বা বাংলা ভাষা ভবিষ্যতে অন্ধকার থেকে আলোয় আসবে কি না, তা কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না। সদর্থক পদক্ষেপের বদলে এই হা-হুতাশ ও নেতিবাচক সমালোচনা বরং সাধারণ পাঠককে বাংলা ভাষাচর্চা সম্বন্ধে অনাগ্রহী করে তোলে -- কোনও জনগোষ্ঠী বা কয়েকজন ব্যক্তি সম্পর্কে জনমানসে বিরূপ অথবা ভ্রান্ত ধারণা গড়ে ওঠাও অসম্ভব কিছু নয়। এই মনোভাব ভাষা, ব্যক্তি বা জাতির উন্নতির সহায়ক হতে পারে না কখনও।
         অথচ দৈনিক সংবাদপত্র বা অন্যান্য সাময়িক পত্রাদিতে আমরা কিন্তু বিষয়টি সম্পর্কে বেশ কিছু সুষম (balanced) লেখা পড়েছি। সেগুলোতে সমস্যার উত্স ও সমাধানসূচক কিছু সম্ভাবনাময় প্রস্তাব সম্পর্কেও জেনেছি। এর মধ্যে নিজেরও কয়েকটা নিবন্ধ রয়েছে। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষাচর্চার ইতিবাচক নানা দিকের খবরও সংবাদপত্রে পেয়েছি। সেগুলো কেন যে নেতিবাচক সমালোচকদের চোখ এড়িয়ে যায় তা বুঝি না। তাই না জেনেশুনে কিছু বিরূপ উক্তি বা হা-হুতাশ যখন করতে দেখি তখন লেখাগুলোকে মনে হয় বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অথবা গড্ডলিকাপ্রবাহে ভাসমান প্রলাপ। 'পরিবর্তিত পরিস্থিতি'র বুলি কপচিয়ে লেখকেরা পুরনো সিদ্ধান্ত, ক্লিশে যুক্তিতেই আটকে থাকেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে যদি সত্যিই তাঁরা আগ্রহী হতেন তবে যে লেখাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলাম, সেগুলো পড়া ছাড়াও বছর পাঁচেক ধরে এই উপত্যকায় বাংলা ভাষাচর্চার ঊর্ধ্বমুখী গতিকে উপলব্ধি করতে পারতেন। বাংলা ভাষা যদি এখান থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার দিকেই পা বাড়িয়ে থাকে, তবে ক্রমাগত বাংলা বই প্রকাশের সংখ্যাটা বাড়ছে কেন? কেন বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতে বাংলা সম্প্রচারের সময় বাড়ছে ? কেন বাংলা সংবাদপত্রের সংখ্যাটাও বাড়ছে ? কেনই বা এখানকার সাহিত্যচর্চা ও প্রকাশনা পশ্চিমবঙ্গে স্বীকৃতি পাচ্ছে ? তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় যে, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষার ভবিষ্যত্ ঘোর অন্ধকারে, তবে বাংলা চর্চার উল্লিখিত দৃষ্টান্তগুলো এখানকার বাঙালিদেরই সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার লড়াই হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত -- যা আর কোনও অঞ্চলের বাঙালি করেনি, করে না, করবেও না। কারণ আর কোনও অঞ্চলের বাংলা ভাষাচর্চা খাদে পড়েছে বলে তো কেউ হা-হুতাশ করছে না। তাহলে আমরা আপাতত একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, এখান থেকে বাংলা ভাষাটা চিরতরে হারিয়ে যাবার আশঙ্কাটা অমূলক। 
         ইতিহাস বলে, এতদঞ্চলে সুপ্রাচীন কাল থেকেই বাঙালিরা আছেন। যাঁরা আগ্রহী তাঁরা অন্তত শ্রদ্ধেয় সুজিত্ চৌধুরীর এ-সম্পর্কে লেখা প্রবন্ধগুলো একবার পড়ে নিতে পারেন। তবে এটা স্বীকার্য যে, দেশভাগের ফলে ওপার বাংলা থেকে প্রচুর মানুষ ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ বা বরাকভূমির মতো এই ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতেও আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন (বরাক উপত্যকায় অনেকের স্থানান্তর না ঘটলেও দেশান্তর হয়ে গেছে), কেউ কেউ চাকরি বদল করেও চলে এসেছিলেন। এছাড়া রেল বা অন্য সরকারি-বেসরকারি চাকরিসূত্রে বহু বাঙালি পশ্চিমবঙ্গ অথবা ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এখানে এসেছিলেন -- যাঁদের অনেকেই বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছেন। এঁদের মধ্যে, বিশেষত পূর্ববঙ্গমূল বাঙালিদের সন্তান-সন্ততিরা এখানকার মাটিতে জন্ম নিলেও পূর্বপুরুষের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিচ্ছিন্নতার মনোভাব কাটাতে পারেননি। অন্তত অনেকের ক্ষেত্রে কথাটি সত্য। অবশ্য এঁদের পরবর্তী বা নবীন প্রজন্ম পূর্বপুরুষবাহিত স্বদেশভাবনাকে আমল দিতে পারেন না। প্রথমত, এই দেশচিন্তা তাঁদের কাছে এক দূরতর ইতিহাস, যে ইতিহাস কখনও পড়বার সুযোগ হয়নি। দ্বিতীয়ত, গতিময় পৃথিবীতে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হবার চিন্তা তাঁদের কাছে পূর্বপুরুষের দেশচিন্তার চেয়ে অনেক বেশি প্রিয়। সুতরাং এঁদের কাছে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিষয়ক কাঁদুনি গেয়ে কোনও লাভ হবে না। বরং এখানে বাংলা ভাষা ব্যবহারের বাণিজ্যিক লাভালাভের চাবিকাঠি যদি তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া যায় তবে তা তাঁরা লুফে নেবেন। নিচ্ছেনও। মাতৃভাষাটাও যে উপার্জনে সাহায্য করতে পারে সে-কথাটা যখন কর্মশালার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের জানিয়ে দিই তখন তারা উত্সাহিত হয়। আশ্চর্যজনক ভাবে কাঁদুনি গায়কেরা সে খবরে উদাসীন থাকেন। 
          যাঁরা এই নতুন প্রজন্মের নন তাঁদের কাছে দেশ ও ভাষা হারানোর বিষয়টি উপভোগ্য বিশ্রম্ভালাপ। অবশ্য পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই বিশ্রম্ভালাপে মদত দেয়। সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। কিন্তু অসম যাঁদের জন্মভূমি তাঁদের তো দেশ হারানোর ব্যথা থাকা উচিত নয়। বহুদিন রাজনৈতিক কারণেই এখানে আত্মীকরণ প্রক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে ছিল বলে তাঁদের মনে জন্ম নিয়েছে নিজভূমে পরবাসীর যন্ত্রণা। আজ যখন চারদিকে উদারীকরণের হাওয়া বইছে তখন আমরাও চাইব ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যাবতীয় সম্পর্কের মধ্যে সেই উদারীকরণের প্রকাশ ঘটুক। তাহলে সেই আত্মীকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে এবং নিজভূমে পরবাসীর যন্ত্রণা থেকেও আশা করি মুক্ত হওয়া যাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই প্রক্রিয়া দ্বিমুখী -- 'দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে'। যাঁরা মনে করেন এখানে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন তাঁদেরই তো এই প্রক্রিয়ায় অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া উচিত। ভেবে দেখুন, আজ ওই বিপন্নতার অন্যতম চিহ্ন হিসাবে পাঠ্যবইতে অসমিয়া শব্দ সংমিশ্রণের প্রাবল্যকে তুলে ধরা হচ্ছে -- তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে যে এখানে অসমিয়া ছাত্রদের বাংলা ভাষাতেই পড়াশোনা করতে হয়েছে, সে-কথা মনে আছে তো ? যদিও সেটা ব্রিটিশ নীতির অবদান, তবু সেই যন্ত্রণা কি বাংলা পাঠ্যবইতে অসমিয়া শব্দ সংমিশ্রণের চেয়ে কম ? আমি বলছি না যে, একমাত্র সেজন্যই পাঠ্যবইয়ের ভুলটা যুক্তিযুক্ত। কোনও ভুলই সমর্থনযোগ্য নয়। একটা ভুল দিয়ে অন্য ভুল সংশোধন করাও যায় না। আত্মীকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়াটাও একরকম ভুল। তাই বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধির জন্যই আত্মীকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। 
          আত্মীকরণ মানে কিন্তু আপোস নয়, আত্মবিনষ্টিও নয়। অন্যকে জানার মাধ্যমেই আত্মবিস্তার ঘটে -- বাঙালি এ-ভাবেই জগতের আনন্দযজ্ঞে নিমন্ত্রণ পেয়েছিল। নিজেকে কূপমণ্ডূক করে রেখে নয়। অসম সাহিত্য সভার সাম্প্রতিক ক্রিয়াকর্মের দিকে চোখ রাখতে অনুরোধ করছি। শুভকাজ যত ছোটই হোক, যত ত্রুটিই থাকুক আয়োজনে -- তার প্রভাব ও ব্যাপ্তি সুদূরপ্রসারী। এখানে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দিহান শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাবন্ধিকেরা সাহিত্য সভার কাজকর্মগুলোকে যদি সমর্থন করতে পারেন তবে আখেরে বাংলা ভাষারই লাভ। বলা বাহুল্য, এতে অসমিয়া বা বাঙালি জাতিসত্তার কোনও রকম হানি হচ্ছে না। এছাড়া অসম ও বাংলাকে কেন্দ্রে রেখে সাহিত্য অকাদেমি যে কাজগুলো করছেন সে-সম্পর্কে সদর্থক বিশ্লেষণেও লেখকেরা এগিয়ে আসতে পারেন। গুয়াহাটির 'সাতসরী' সাময়িক পত্রিকাটি অসমিয়া ও বাঙালিদের সম্পর্ক নিয়ে যে দুটি অসাধারণ সংখ্যা করেছিল বা স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তরে অসমিয়া ছাত্র-ছাত্রীরা যে বাংলা সাহিত্য পড়েন (অনেক কলেজে বাংলার অধ্যাপকেরাই সেগুলো পড়ান), সে-সম্পর্কে দু-কলম প্রশংসাসূচক মন্তব্য যদি এই প্রাবন্ধিকেরা লিখতে পারেন তবে আশা করি তাঁদের মনে হবে না যে, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষার ভবিষ্যত্ ঘোর অন্ধকারে। 
          প্রসঙ্গত বলি, ভাষাবিলুপ্তির একটী কারণ হিসাবে ভূখণ্ড আর জনগোষ্ঠীর বিচ্ছেদকে আজকাল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তত্ত্ব হিসাবে একে অস্বীকার করার কোনও সঙ্গত কারণ নেই -- ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা জুড়ে ক্ষেত্র সমীক্ষা করলে হয়তো উপযুক্ত উদাহরণও খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু সার্বিকভাবে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় এরকমটি ঘটার কোনও সম্ভাবনা এখনও দেখা দেয়নি। অসম ভারতবর্ষের অন্তর্গত একটি রাজ্য, ঠিক যেমন পশ্চিমবঙ্গ। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিভিন্ন দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে অসমের যোগাযোগ রয়েছে (বাংলাদেশের সঙ্গে বরাকভূমির সাংস্কৃতিক যোগাযোগও তো রয়েছে)। এই যোগাযোগ যেদিন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, একমাত্র সেদিনই অসম তথা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিদের সঙ্গে ভারত ও বহির্ভারতের বাঙালিদের সংযোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হবে। আর তখনই তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখানে জাতি এবং ভাষার বিলুপ্তি ঘটবে। 
          এবারে দুটি কথা পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে বলব। প্রথমটি বাংলা মাধ্যমের স্কুলে অসমিয়াভাষী শিক্ষক নিয়োগ সম্পর্কে। এটা নিয়ে ইতিমধ্যেই শোরগোল উঠেছে। উপযুক্ত জায়গায় আবেদন, নিবেদন এবং প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। মোটকথা এখানকার বাঙালিরা সমস্যাটি সম্পর্কে উদাসীন নন। তবে সমস্ত মহল থেকে প্রচেষ্টার মাত্রাটা বাড়ানো প্রয়োজন। সম্পূর্ণ বিষয়টি শিক্ষা বিভাগের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। হয়তো আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এ-বিষয়ে আমার একটি বিকল্প সিদ্ধান্তের কথা গুয়াহাটির 'সংলাপ'  সাময়িক পত্রিকাটিতে লিখেছিলাম। উত্সাহী পাঠকেরা সেটা পড়ে নিতে পারেন। এখানে শুধু বলে রাখি, এরকম নিয়োগের আগে প্রার্থীর জন্য এক মাস বাংলা ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলে আর কারও আপত্তি থাকবে না আশা করি। এরকম আরও কয়েকটি প্রসঙ্গ আছে যা মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব সম্পর্কে উদগ্রীব করে তোলে এবং যার সমাধান রাজনৈতিক ভাবেই করা সম্ভব। যেমন 'ডি' ভোটার বা হোজাইয়ের দেশবন্ধু বিদ্যাপীঠে শিক্ষক নিযুক্তির অভাবে '২০০৩ সাল থেকে উচ্চতর মাধ্যমিকে বাংলা মাতৃভাষা বিষয়টির পাঠদান বন্ধ' (মাসিক যুগশঙ্খ, এপ্রিল ২০১১) ইত্যাদি প্রসঙ্গ। এগুলো নিশ্চিহ্নায়ণ প্রক্রিয়ায় কিছু পরিমাণে মদত দেয় ঠিকই, তবে এ-পথেই ক্রমে অন্ধকার হবে -- এ-ধরনের সরলীকরণে আমি বিশ্বাসী নই। কারণ অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা এ-ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে নির্ভাবনায় দিন কাটাচ্ছেন এমনটা নয়। 
         তবু বিভিন্ন বিষয়ে উদাসীন থাকা বা ইচ্ছাকৃত ভাবে বাংলা ভাষার মৃত্যুকে ডেকে আনার মতো অভিযোগগুলো ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অবিরাম সম্প্রীতির  সম্পর্ক গড়ে তোলায় সচেষ্ট, নিরলস আত্মপ্রতিষ্ঠা ও আত্মীকরণের প্রক্রিয়ায় সামিল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিদের ওপর এই অভিযোগ দুর্ভাগ্যপূর্ণ ও অনভিপ্রেত। এটা বোঝার ক্ষমতা অভিযোগকারীদের মনে পুনর্জাগরিত হোক -- এই কামনা করি। আমি আগেও বলেছি, যা দূরতর ইতিহাস, সে-সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র চেতনা বর্তমান প্রজন্মের নেই। তবু এখানে নিয়ম করে উনিশে মে বা একুশে ফেব্রয়ারি পালিত হয়। অথচ ভালো করেই জানি, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যাঁরা শহিদ হয়েছেন (সংখ্যাটা এগারোর চেয়ে বেশি হলেও), তাঁদের জন্য উপত্যকার বাইরে বাংলা ভাষার শুভচিন্তকেরা কখনও কোনও সভা আয়োজন করেননি। করে থাকলে আমাকে পরিসংখ্যান জানাবেন, আমি মন্তব্য তুলে নেব। বর্তমান সময়ে বাঙালিরা পরস্পর অসমিয়াতে কথা বলেন -- এই অভিযোগও অবান্তর। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সাধারণ ভাবেই ইংরেজিতে নয়, অসমিয়াতে কথা বলাই এখানকার রীতি। যস্মিন দেশে যদাচারঃ। এতে বোঝায় না যে এখানকার বাঙালিদের জন্যই বাংলা ভাষার নাভিশ্বাস উঠেছে। 
          কারও কারও মতে এই উপত্যকায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপককুলই ভাষাটির দীন অবস্থার জন্য দায়ী। তাহলে তো এখানকার বাজার অর্থনীতি, রাজনীতি ইত্যাদির মন্দ অবস্থার জন্য এই বিষয়গুলোর অধ্যাপকেরাই দায়ী হবেন। একটা বিশাল ভৌগোলিক পরিমণ্ডলের সামান্য কয়েকজন বাংলার শিক্ষক কীভাবে ওই অঞ্চলের বাংলাভাষী মানুষের আদরের ভাষাটির অধঃপতনের জন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী হন, তা বুঝি না। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যত বাঙালি আছেন সবাই কি ওই শিক্ষকদের ছাত্র-ছাত্রী ? না কি একমাত্র বাংলা নিয়ে বা বাংলা মাধ্যমে যাঁরা পড়াশোনা করেন তাঁরাই বাঙালি ? এটা না হলে তো বাঙালিদের ভবিষ্যত্ বাঙালি অধ্যাপককুল নষ্ট করতে পারেন না। হ্যাঁ, বেনোজল সর্বত্রই আছে -- থাকলেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা শেখানোর আখড়া নয়। মূল শেখাটা ছাত্র-ছাত্রীরা আগের পর্বেই চুকিয়ে আসে। এখানে শুধু কিছু ভুল-ত্রুটি শুধরে দেওয়া যায়। আর দেখানো যায় ভবিষ্যতের পথ। এর চেয়েও বড় প্রশ্ন, বাংলা মাধ্যমে এখন পড়ছে কারা ? মেধাসম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা খুব কম। মাধ্যমিক পর্যন্ত দশ-বারোটি রবীন্দ্র-কবিতা, নজরুলের তিনটি, মাইকেল মধুসূদন দত্তের দুটি, সুকান্তের দুটি কবিতা বা বঙ্কিমচন্দ্র- শরত্চন্দ্রের কয়েকটি গল্প-উপন্যাসের অংশ পড়ে বাঙালির উত্তরাধিকার গড়ে ওঠার কথা কল্পনা করা নিতান্ত বাড়াবাড়ি। বাড়িতেই তো চর্চার অভাব। এ-সম্পর্কে অন্যত্র লিখেছি -- তাই অহেতুক বিস্তার করছি না। তবে হ্যাঁ -- বিদ্যায়তনিক বাংলা পঠন-পাঠন হয়তো এখানে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ ছাত্র-ছাত্রীর অভাব। এখানেও একটি 'যদি' আছে। ভাষাশিক্ষার সঙ্গে উপার্জনের সবল মণি-কাঞ্চন যোগাযোগ ঘটলেই ছাত্রসংখ্যা বাড়বে। আর প্রয়োজন সিলেবাসে যথোপযুক্ত পরিবর্তন। দুটি দিকেই এখানে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। এখন বাংলা মাধ্যমে পড়েছেন বা পড়েননি -- সমস্ত বাঙালি অভিভাবকের শুভবুদ্ধির ওপর আমাদের নির্ভর করতে হবে। তাহলে বিদ্যাচর্চার দিক থেকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষা অবলুপ্তির ভয় কিছুটা হলেও কমবে। 
         ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষার স্থিতি সম্পর্কে আমাদের ভাবনাটা তাহলে দাঁড়াবে এই রকম -- পুরনো কাসুন্দি না ঘেঁটে সম্পর্কের নব রসায়নকে আরও নিবিড় করার মানসে আত্মীকরণ প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিলে এবং ন্যায্য দাবিগুলো সার্বিক প্রচেষ্টায় আদায়ের চেষ্টা করলে বাংলা ভাষাও রসাতলে যাবে না।
-------------------       

Monday 11 April 2011

ঘুম আয়না

ঘরের ভেতর খৈতানের একটানা শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। মাঝে-মাঝে ক্যালেন্ডারের ফরফর পাতা ওড়ার আওয়াজ। স্ট্রিট লাইটের আবছা আভাস মশারির ওপর এসে পড়ছে। এখন স্বপ্ন দেখার সময়। কোথায় যেন পড়েছিলাম, সাইকিয়াট্রিস্টরা রোগীদের বলে দেন রাতের স্বপ্নগুলো লিখে রাখতে। তাহলে না কি রোগ সারানোর সুবিধে হয়। আমার তো রোগ সারাতে স্বপ্ন দেখবার প্রয়োজন হয় না। আমি ভাবি, যদি এমন হয়। যদি এভাবে হয় -- ভাবতে-ভাবতে কোথায় যে চলে যাই! কেন যাই ? তৃপ্তি চাই। বিকেলের মন রাত হলে যেভাবে হাতড়ে বেড়ায় সেভাবে আমার সাথে কথা বলি। কত যে হিজিবিজি আঁক -- ছাই, মাথামুণ্ডু আছে নাকি তার। অন্তত স্বপ্নে মোষের মতো হিংস্র প্রাণী বা সাপ বা অন্য কারো তাড়া খেয়ে ঘেমে-নেয়ে একসা হবার চাইতে তো ভালো !
আমার চারদিকে দেওয়াল। মনের জানালা দিয়ে আলো আসে -- কারা যেন যায় নানা পথ বেয়ে। সেই পথের রেখা,তার দু-ধারের ছবিগুলো মনে ভিড় করে আসে। আমি দেখি, স্বপ্নের ছবি দেখি সেইসব সময়ের। ঘুমের ঘোরে ......
রাত গড়িয়ে এলে বৃষ্টি নামল। প্রথমে অঝোরে তারপর থেমে থেমে একবার বেশি একবার কম। মরশুমের এই প্রথম বৃষ্টিতে কান্না নয় খুশির গান। বর্ষায় একটানা একঘেয়ে টিপটিপ বড় ক্লান্তিকর। তখন চারদিকে জল থইথই। ব্যাঙের ডাক আর কচুরিপানার গা-মোচড়ানো গন্ধ। মনে পড়ে দু-দুটো বন্যার কথা। চারদিকে জল। এখানে তখন বসতি কম। দিনের বেলা দূরের বাড়িগুলোকে দ্বীপের মতো দেখায়। পাশের বাড়ির দেওয়াল দেখে রোজ জল মাপি -- এক বাঁও দো বাঁও করে সে বেড়েই চলে। কোমর জলে হেঁটে হেঁটে অফিসবাবুরা, কাজের মেয়েরা সকালে যায় বিকেলে ফেরে। আর রাতগুলো কাটতেই চায় না। একটানা দশদিন বৃষ্টির পর আর বাড়িতে থাকা গেল না। পুজোর মুখে বেরিয়ে গেলাম এক কাপড়ে। শহরের বন্যা গ্রামের চেয়ে অন্যতর। দুটো লম্বা বাঁশের ওপর কাঠের পাটাতন ফেলে বাড়ির মেয়েদের নিয়ে গেল উদ্ধার করে। আমি বাবাকে বগলদাবা করে -- কখনও বুকজল কখনও গলাজলে ভেসে-ভেসে। সে এক মজার দৃশ্য। তিন-চারদিন পর ফিরে এসে দেখি বেড়া ডিঙিয়ে বাগানে যে কচুরিপানাগুলো ঢুকেছিল তারা সবাই জল না পেয়ে খুব মুষড়ে পড়েছে। প্রথমেই ওদের তুলে সামনের মাঠে জমা জলে ফেলে দিয়ে পুনর্জীবিত করলাম। স্কুটারের গাল বেয়ে কান্না গড়িয়ে পড়ার দাগ তখনও স্পষ্ট। কী করব? বাধ্য হয়েই তো ওকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। সঙ্গে নেবার উপায় থাকলে নিয়েই যেতাম। এবার ওকে শুইয়ে দিলাম। পেট থেকে প্রচুর জল বেরলো। তবু তার সঙ্গীন অবস্থা। ঠেলায় উঠিয়ে সোজা ডাক্তারের চেম্বার। ঘন্টাখানেকের চেষ্টায় জ্ঞান ফিরল। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে আরও কিছুক্ষণ। বিকেলের আলো গড়ানোর আগেই বাড়ি ফেরা গেল। এর মধ্যে পেছনের উঠোন এবং কলতলা থেকে কোদাল দিয়ে জমা পলি চেঁছে ফেলা হয়েছে। বালতি বালতি জল গেছে গন্ধ ছাড়াতে। পুজোটা সেবার মনে রাখার মতো করে কেটেছিল।

Saturday 9 April 2011

রাতগুলো

চাতালের ডান কোণ ঘেঁষে তুলসি মঞ্চ। একটা মোম জ্বালানো হয়েছে, মঞ্চের মাটিতে গোঁজা হয়েছে দুটো সুগন্ধি ধূপকাঠি। দীপের বদলে রবিঠাকুরের নায়িকা মোম নিয়ে যখন ওখানে যায় তখন এ-বাড়ি সত্যি উজ্জ্বয়িনীর প্রাসাদ হয়ে ওঠে। মালবিকা, মা, মামনি ..... অনেক নাম তার। এ-সময়ে তার হাতের এক কাপ গরম চা বড় উপাদেয়। গরমটা এখনও ঠিক তেমন পড়েনি তাই। নাহলে চা-টায় ছ্যাঁকা লাগত। একটু ঠাণ্ডা হয়ে আসার প্ল্যান তো ছিলই। কিন্তু হল কই! শিলং থেকে টংলা --- সবই এখন টঙে তোলা। মেয়ের পরীক্ষা, আমার কাজ, সংসারের ব্রেক আপ-ডাউন করতে-করতেই সময় পেরিয়ে যায়। একটুও দম নেবার জো নেই।
চায়ের কাপ হাতে সে পাশে বসল -- গরমের ছুটির দরখাস্ত দেব এবার। ক'দিন থেকে আসব মায়ের কাছে। বিস্কিট আরেকটা দেব? আটটা বাজলেই রাইস-কুকারটা বসিয়ে দিতে হবে। রাতে তোমার জন্য পাতলা মাছের ঝোলটা আছে। দেখি মা-কে একটু ফোন করে।
ওর কথার গ্রাফ আঁকা কারও কম্মো নয়। তবে টেবিলের ওপর সেলটা বেজে ওঠে তখনই। টেলিপ্যাথি।
একপ্রস্থ আদান-প্রদানের পর ফোন যথাস্থানে যায়। বোনটা একা পড়ে আছে সেই কত দূরে! দু-দুটো বাচ্চা নিয়ে হিমসিম। ওর বরের নতুন প্রোজেক্ট নিয়ে বদলির সম্ভাবনা শিলং বা আন্দামানে। ইস্ যদি কাছাকাছি থাকতাম দুবোনে।
সত্যিই তো। আজকাল কোম্পানিগুলো কেমন যেন। আমাদের সুবিধে অনুযায়ী বদলি করতে একটুও সায় দেয় না। বউ-বাচ্চা থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকো। শুধু কাজ করো আর আমায় মুনাফা দাও। কাজের মানুষগুলোর মন থেকে সবুজ-নীল রঙগুলো একেবারে উধাউ করে দেবার নেশায় মত্ত।
বললাম, শিলং হলেই তো ভালো হয়। আমরাও মাঝে-মধ্যে ঘুরে আসতে পারি তাহলে।
--- আগে হোক, তারপর বোলো।
বৃষ্টি আসছে বোধহয়। যে জানালায় দিনের বেলা রোদ খেলা করে, সেখানে এখন বিদ্যুতের ঝিলিক। ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে, সঙ্গে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। কয়েকটা পাখি ভয় পেয়ে বোধহয় একটু ওড়াউড়ি করে নিল।
তিন্নি ডাকল, মা পড়ার ঘরে জানালাটা বন্ধ করে দাও তো।
--- আসি দাঁড়া। ইস্ কী সুন্দর ঠাণ্ডা বাতাস! আমি যদি পাখি হতে পারতাম......

Friday 8 April 2011

মাঝের কয়েকটা দিন

এরপর পাখিটার জন্য আমি হাপিত্যেস করে বসে থাকি। একবার এই ঘুলঘুলি তো আর একবার পাশেরটা। কই এল না তো! কাঁচের ওপাশে বসে ডাকল না তো খুট-খুট শব্দে! পাখি তো, হুঁঃ, তার ওড়ার আনন্দে আমাকে ভুলেই গেছে। যারা উড়তে পারে তারা এমন কত প্রতিশ্রুতি ভুলে যায় । এ শুধু আমার হাতে নাড়ু ধরিয়ে দেওয়া। উড়েই খালাস। আর চোখ রাখব না তো ঘুলঘুলিতে। আসুক না আসুক, কিচ্ছুতে তাকাব না ওইদিকে।
ওদিক থেকে চোখ ফেরাতেই অজন্তা জানান দিল সময় হয়েছে ওষুধ নেবার। ভারি সময় জ্ঞান ওর। আমি কখন কি খাব না-খাব, পরব না-পরব, সকালের কাগজটা দেখব কি দেখব না -- এই ব্যাপারগুলো ওর ওপরেই আমাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে। একদিক থেকে ভলোই হয়েছে -- এই অখণ্ড অবসরটাও নিয়মমাফিক কেটে যাচ্ছে। ভালোই লাগছে। অনেকের নেক নজরে থাকলে বেশ আমোদ হয়। যারা ভালো চায় তারা তো দেখাশোনা করেই -- বাকিরাও বাদ যায় না। এই যেমন পাখিটা......
অজন্তার মতো রূপালিও কম যায় না। সেও চোখ রাখছে সর্বক্ষণ। অজন্তা যদি আছে ডানদিকে তো রূপালি বাঁয়ে। রূপালি যদিও বয়সে বড় তবু বয়সটা রূপ দিয়ে বেঁধে রেখেছে। যখনই দেখবে তখনই সে সেজেগুঁজে রয়েছে -- একেবারে ফ্যামিলি সোপের মেয়েদের মতো। চাকচিক্য তার সারা শরীরে। বাড়িতে থাকলেও মাঝেমাঝে মাথায় সাদা টুপি চড়াবে, যেন সাহেবগিন্নি।
ওদিকে অজন্তা ছিল ছিপছিপে। এখন একেবারে গিন্নিবান্নি চেহারা। মুখটা বেশ ভরা-ভরা, মা-দুর্গার মতো। একবার দেখলেই যে-কোন মানুষের ভালো লেগে যাবে। বলতে বাধা নেই, সিলেকশন আমারই। রূপালি অবশ্য নিজেই এসেছে। সে অন্য কাহিনি ... পরে বলা যাবে। এখন এদের সঙ্গ দিয়েই অবসরের অনেকটা কাটে।
অজন্তা বলতেই তিন্নি প্যাকেট ঘেঁটে দুটো ক্যাপসুল আর জল নিয়ে এল। আমাকে ওষুধ খাওয়ানোর দায়িত্বটা তার ওপরেই পড়েছে। ওষুধটা খেতে-খেতে আবার ঘুলঘুলির দিকে চোখ পড়ল। না এখনও আসেনি। ওড়ার আনন্দের কথা কখনও কি জানব! সন্ধে হলে সে তো আর আসবেও না।
এল না। এক চিলতে নীলাভ গান দিনের সুর শেষ করে পর্দা টেনে দিল। নিয়ন বলে দিল, সন্ধে হয়েছে।........

Tuesday 5 April 2011

surur kathaকথন্তর

আমার এখন অনন্ত অবসর। ঘর থেকে বাইরের জন্য মুখিয়ে থাকা ছাড়া আর করবার কিছু নেই। বাইরে অনন্ত সমুদ্র -- আকাশ। অফুরন্ত নীলের খেলা, সবুজের মেলা। পাখিটা বলে গেল -- জেগে থেকো, এ জানালাতেই আবার চোখ রাখব তোমার জন্য।
--আমায় গান শোনাবে?
--সে তো আমাদের পুরনো কাজ -- আমি একটা নতুন কাজ করতে চাই।
আমি ভাবি পাখি আবার কেমন নতুন কাজ করবে! ও বোধহয় আমার ভাবখানা বুঝল। বলল, আমি তোমাকে আমার আনন্দ দেখাব।
পাখির আনন্দ! সেটা আবার কী?
--ওড়ার আনন্দ। সেটাও  জানো না বুঝি!
আমি ভেবে পাই না পাখির ওড়ার আনন্দ আমি দেখব কীভাবে। পাখি একটু মুচকি হেসে উড়ে গেল এক চিলতে নীলে....
তারপর কী হল?........